Lamiya khan lamha

Lamiya khan lamha

Share

আসসালামু আলাইকুম,
"ভালোবাসা, কষ্ট, আবেগ,টানাপোড়েনে গড়া শব্দের জগতে আপনাকে স্বাগতম জানাই আমি
(লামিয়া খান লামহা)

09/07/2026

#আবুজ_পাখির_বায়না
#লেখনীতে_লামিয়া_খান_লামহা
#পর্ব_২৫

⭕কপি করা কঠোর ভাবে নিষেধ 🚫❌

রাত তখন গভীর।
বাইরে প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি চলছে।
আকাশে একের পর এক বজ্রপাত হচ্ছে, যেন প্রকৃতিও অস্থির হয়ে উঠেছে।

নিজের ফোনের স্ক্রিনে ভেসে থাকা ছবিটার দিকে কয়েক সেকেন্ড স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তাজ।
তার চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠল।
মুঠো করে ধরল ফোনটা।মাথার ভেতর হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।যে ভালবাসার মানুষটার জন্য সেতার পরিবারের বিরুদ্ধে গিয়েছে ,, সে ভালোবাসার মানুষটাই নাকি শেষে বিশ্বাসঘাতক বের হলো। সাথী কে ধোঁকা দিবে এইভাবে এটা সে কল্পনা করতে পারে না।

অবশেষে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না তাজ
তাড়াহুড়ো করে গাড়ির চাবি তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। আজ সাথী নামের চরিত্রহীন মেয়েকে একটা চরম শিক্ষা দিবে তা আজ।

(প্রত্যেকটা মানুষের জীবনে প্রথম প্রেম আসে বসন্তের মত,, প্রথম ভালোবাসা হয় সকালের স্নিগ্ধ সূর্যের মতো,,, চকচাকে সোনালী সূর্যের দিকে যেমন অনেকক্ষণ যাবৎ তাকিয়ে থাকা যায় না তেমনি জীবনে প্রথম আসে ভালোবাসার মানুষটাকে চিরকাল নিজের কাছে রাখা যায় না। আমরা বরাবরই প্রথম ভালবাসি ভুল মানুষকে। নিজেদের সবটুকু দিয়ে ভালোবাসার পরেও যদি সে মানুষটা আমাদের দুঃখ দেয়, প্রতারণা করে, আমাদের ভালো মানুষের সুযোগ নেয় তখন সেটা হয়ে যায় আমাদের কাছে মৃত্যু সম কষ্ট। এই কষ্টের পার বহন করা যে খুবই কষ্টের।))

তাজ কাউকে কিছু না বলে বেড়িয়ে যায় খান বাড়ি থেকে। বাহিরে প্রচন্ড ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে কিন্তু তার সবকিছু উপেক্ষা করে ছুটলো নিজের প্রিয়সির কাছে। যে প্রিয়সী তাকে চরমভাবে ঠকিয়েছে, প্রতারকনা করেছে তার সাথে। ভালোবাসার নামে ছলনা করেছে এতগুলো দিন, মাস,বছর।। কাজ ভালবাসা অন্ধ হয়ে তা বুঝতে পারেনি।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাজের গাড়ির শব্দ মিলিয়ে গেল ঝড়-বৃষ্টির গর্জনের মাঝে।

---

এদিকে খান বাড়িতে তখন অন্য এক ঝড় নেমে এলো।

তাজ বেরিয়ে যাওয়ার মাত্র কয়েক মিনিট পর রেখা বেগমের ফোন বেজে উঠল।
ফোনটা করেছে রেখা বেগম এর ভাই।
কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে কান্নাভেজা কণ্ঠ শোনা গেল।

কথাগুলো শুনে রেখা বেগমের হাত থেকে ফোন প্রায় পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।

মুহূর্তের মধ্যেই তার মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

— না... না... এটা হতে পারে না...

পরের মুহূর্তেই তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন।

তার কান্নার শব্দ শুনে বাড়ির সবাই ছুটে এলো।

কোহিনুর বেগম আঁতকে উঠে বললেন,

— কী হয়েছে রে?

রেখা বেগম কান্নার মাঝেই বলতে লাগলেন,

— মা... আমার মা আর নেই...

কথাটা শুনে পুরো বাড়ি স্তব্ধ হয়ে গেল।

কেউ যেন প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিল না।

রেখা বেগম মেঝেতে বসে পড়লেন।

বুক চাপড়ে কাঁদতে লাগলেন।

— আমি আমার মাকে আর দেখতে পাব না...

অনন্যা বেগম, লিপি বেগম আর সালমা বেগম তাকে জড়িয়ে ধরে সামলানোর চেষ্টা করলেন।

রেজা খান, কবির খান, বেল্লাল খান, জিহাদ খান —সবার মুখ ভার হয়ে গেল।

মায়ের মৃত্যু সংবাদ পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন সংবাদগুলোর একটি।

কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত যে বাড়িতে স্বাভাবিক পরিবেশ ছিল, সেখানে মুহূর্তেই শোকের ছায়া নেমে এলো।

কোহিনুর বেগম নিজেও চোখ মুছলেন।

এদিকে আনিকা, রাহা, হিয়া,, টুম্পা,, রুম্পা, ছোট টিয়ান সবারি মন খারাপ হলো ।

রেখা বেগমকে এমন অসহায় অবস্থায় তারা কখনও দেখেনি।
কিছুক্ষণ পর কবির খান নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন,

— আমাদের দ্রুত যশোর যেতে হবে।

রেজা খান মাথা নাড়লেন।

— ঠিক বলেছো ভাইজান।

সিদ্ধান্ত নিতে বেশি সময় লাগল না।
খান পরিবারের সবাই একসঙ্গে যশোর যাবে।
প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নেওয়া হলো।

তবে সব প্রস্তুতির মাঝেই হঠাৎ ধূসরের মনে প্রশ্ন জাগল।

সে চারপাশে তাকিয়ে বলল,

— বড় ভাই কোথায়?

কথাটা শুনে সবাই থমকে গেল।

ঈশান বলল,

— কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত তো বাড়িতেই ছিল।

রাহা ভ্রু কুঁচকে চারপাশে তাকাল।

— আমি তো তাকে গাড়ি নিয়ে যেতে দেখেছি অনেকক্ষণ আগে। হয়তো বাহিরে গিয়েছে।

এই ঝড়-বৃষ্টির রাতে তাজের গাড়ি নিয়ে বের হওয়ার স্পষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পেলাম না বাড়ির কেউই। কাউকে কিছু বলেও যায়নি তাজ।
রাজ ফোন বের করে তাজকে কল দিল।

একবার...

দু'বার...

তিনবার...

কিন্তু প্রতিবারই একই উত্তর ভেসে এসেছে—

"The number you are trying to reach is switched off."

ধীরে ধীরে সবার উদ্বেগ বাড়তে লাগল।

এমন সময়ে তাজের ফোন বন্ধ থাকা স্বাভাবিক নয়।

কিন্তু রেখা বেগমের মায়ের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর আর অপেক্ষা করার সুযোগও ছিল না।

শেষমেশ অনেকটা বাধ্য হয়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো—

তাজকে ছাড়াই সবাই যশোর যাবে।

রাত গভীর হওয়ার আগেই একের পর এক গাড়ি খান বাড়ির বিশাল গেট পেরিয়ে বেরিয়ে গেল।

মুহূর্তের মধ্যেই হাসি-কোলাহলে ভরা বাড়িটা অদ্ভুতভাবে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ল।

---

বাড়িতে রয়ে গেল শুধু আনিকা আর রাশেদা খালা।

রাশেদা খালা রাতের খাবার খেয়ে যথারীতি নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পড়েছেন।
মহিলার এক অদ্ভুত ক্ষমতা আছে।একবার ঘুমিয়ে গেলে পৃথিবী উল্টে গেলেও তার ঘুম ভাঙে না।
বাইরে ঝড়, বৃষ্টি, বজ্রপাত—কিছুই যেন তার কানে পৌঁছায় না।

---

অন্যদিকে নিজের ঘরের জানালার পাশে বসে ছিল আনিকা। সামনে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে।
জানালার কাঁচ বেয়ে টুপটাপ করে পানির ফোঁটা গড়িয়ে নামছে।ঘরজুড়ে মৃদু হলুদ আলো।
চারপাশে এক গভীর নীরবতা।অনেকদিন পর আজ বাড়িতে সে একা।অন্য কোন দিন হলে হয়তো তার ভয় লাগতো কিন্তু এখন আর তার ভয় লাগে না।
কেউ বকাঝকা করার নেই।
কেউ জোর করে ওষুধ খাওয়ানোর নেই।
কেউ বারবার জিজ্ঞেস করছে না—

"কেমন লাগছে?"

"শরীর খারাপ করছে না তো?"

আজ যেন সবাই থেকে একটু দূরে, শুধুই নিজের সঙ্গে থাকার একটা সুযোগ পেয়েছে।

আনিকা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। আজ তার প্রচন্ড বৃষ্টি বিলাস করতে মন চাইছে। আজ বৃষ্টিতে ভিজবে বৃষ্টির পানিতে মুছে দিবে অতীতের তিক্ত স্মৃতি। চিরদিনের জন্য ভুলে যাবে অতীতের নিজের সাথে হাওয়া ঘটনা।

তার দৃষ্টি গিয়ে থামল আলমারির ভেতরে রাখা একটা প্যাকেটের উপর।
মেরুন রঙের শাড়ি।আনেক দিন আগে কিনেছিল।
কিন্তু কখনো পরা হয়নি।
আঙুলের ডগা দিয়ে শাড়িটার কাপড় ছুঁয়ে দেখল সে।
অদ্ভুত এক ভালো লাগা ছড়িয়ে পড়ল বুকের ভেতর।

আজ হঠাৎ করেই তার খুব ইচ্ছে হলো—

নিজেকে সাজাতে।
কোনো অনুষ্ঠানের জন্য নয়।
কাউকে দেখানোর জন্যও নয়।
শুধু নিজের জন্য।
অনেকদিন পর নিজের মুখে হাসি দেখার জন্য।

---

ধীরে ধীরে শাড়িটা পরে নিল আনিকা।

গভীর মেরুন রঙটা তার গায়ের রঙের সঙ্গে অপূর্বভাবে মানিয়ে গেল।
তারপর আয়নার সামনে বসে গেল।
খুব যত্ন করে চোখে হালকা কাজল টানল।

ঠোঁটে মৃদু রঙ ছোঁয়াল।

লম্বা চুলগুলো খুলে দিল।
ঘন কালো চুল কোমর ছাড়িয়ে নেমে এলো।
কানে ছোট মুক্তোর দুল।
হাতে কয়েকটা মেরুন কাঁচের চুড়ি।
টুকটুক শব্দ করে চুড়িগুলো নড়ে উঠল।
সবশেষে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখল সে।
এক মুহূর্তের জন্য নিজেই যেন অবাক হয়ে গেল।
এ কি সত্যিই সে?
সেই ভাঙা, ক্লান্ত, হারিয়ে যাওয়া আনিকা?
নাকি বহুদিন আগের প্রাণবন্ত, হাসিখুশি আনিকা?
তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।

অনেকদিন পর।

---

ঠিক তখনই বাইরে একটা প্রবল বজ্রপাত হলো।

আকাশ কেঁপে উঠল।

আনিকা জানালার দিকে তাকাল।

বৃষ্টি আরও বেড়ে গেছে।

ঝমঝম শব্দে পুরো পৃথিবী ভেসে যাচ্ছে যেন।

হঠাৎ তার খুব ইচ্ছে হলো বৃষ্টি দেখতে।

একদম কাছ থেকে।

অনুভব করতে।

সে ধীরে ধীরে রুমে থেকে বেরিয়ে সাদের দিকে হারা দরলো।ছাদে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে,,,

মুহূর্তেই ঠান্ডা বাতাস এসে মুখে লাগলে।
মেরুন শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ে উঠল।

চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গাল ছুঁয়ে গেল।

আনিকা চোখ বন্ধ করল।

ভেজা মাটির গন্ধ।
বৃষ্টির শব্দ।
শীতল বাতাস।

সব মিলিয়ে যেন এক অদ্ভুত শান্তি।

অনেকদিন ধরে জমে থাকা ভারী অনুভূতিগুলো ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসছে।

সে হাত বাড়িয়ে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির পানি ধরল।

ঠান্ডা পানির স্পর্শে তার মুখে শিশুসুলভ হাসি ফুটে উঠল।

আজ যেন বৃষ্টিটা শুধু আকাশে নয়—

তার মনেও নামছে।

সব কষ্ট ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে।রাতটা যেন শুধুই বৃষ্টির জন্য তৈরি হয়েছিল।

আকাশভরা কালো মেঘ, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি, আর অবিরাম ঝরে পড়া বৃষ্টি—সব মিলিয়ে চারপাশে এক অন্যরকম মায়াবী পরিবেশ।

আজ অনেকদিন পর আনিকার মনটা হালকা লাগছে।

বুকের ভেতর জমে থাকা ভারী পাথরটা যেন একটু একটু করে সরতে শুরু করেছে।

আনিকার খোলা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ে উঠল বাতাসে।দূরে কোথাও বজ্রপাত হলো।
এক মুহূর্তের জন্য চারপাশ আলোকিত হয়ে আবার অন্ধকারে ডুবে গেল।

আনিকা ছাদের মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল।মাথার উপর উন্মুক্ত আকাশ।
চারপাশে শুধু বৃষ্টির শব্দ।
প্রথমে কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি এসে তার মুখ ছুঁয়ে গেল।

তারপর ধীরে ধীরে ভিজতে শুরু করল সে।

মেরুন শাড়ির আঁচল বাতাসে উড়ছে।

কপালের পাশে লেগে থাকা চুলের গোছা বৃষ্টির পানিতে ভিজে গাল ছুঁয়ে নেমে এসেছে।

কিন্তু আজ সেসব নিয়ে তার কোনো ভাবনা নেই।

আজ অনেকদিন পর সে নিজেকে মুক্ত মনে করছে।

আনিকা দু'হাত ছড়িয়ে চোখ বন্ধ করল।

বৃষ্টির ঠান্ডা ফোঁটাগুলো মুখে, হাতে, চুলে এসে পড়ছে।

মনে হচ্ছে যেন প্রকৃতি নিজ হাতে তার সমস্ত কষ্ট ধুয়ে মুছে দিতে চাইছে।

তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।

ছোট্ট, শান্ত, প্রশান্ত এক হাসি।

সে ধীরে ধীরে ছাদের এক প্রান্তে গিয়ে দাঁড়াল।

নিচের রাস্তার দিকে তাকাল।

চারপাশ নিস্তব্ধ।

দূরের লাইটগুলো বৃষ্টির পর্দার আড়ালে ঝাপসা হয়ে আছে।

আনমনে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির পানি ধরতে লাগল সে।

তার মনে পড়ল শৈশবের কথা।

কতবার বৃষ্টিতে ভিজতে গিয়ে বকা খেয়েছে।

কতবার লুকিয়ে ছাদে উঠে এসেছে।

আজও যেন সেই ছোট্ট মেয়েটাই ফিরে এসেছে।
যার সুখের জন্য বড় কোনো কারণ লাগত না।
শুধু এক পশলা বৃষ্টিই যথেষ্ট ছিল।
বৃষ্টির মাঝে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ নিজের অজান্তেই হেসে উঠল আনিকা।
সেই হাসিটা ছিল একদম প্রাণখোলা।
কৃত্রিমতা ছাড়া।
ভান ছাড়া।
শুধু নিখাদ ভালো লাগা।
আজকের এই মুহূর্তে কোনো দুঃখ নেই।
কোনো ভয় নেই।
কোনো চাপ নেই।
শুধু আছে বৃষ্টি, রাত আর নিজের সঙ্গে কাটানো কিছু শান্ত সময়।

আর সেই মুহূর্তে আনিকার মনে হলো—

হয়তো জীবন এখনও তাকে পুরোপুরি ছেড়ে দেয়নি।

হয়তো অন্ধকারের পর সত্যিই কোথাও না কোথাও আলো অপেক্ষা করে থাকে। 🌧️❤️✨বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আনিকা সম্পূর্ণ অন্য এক জগতে হারিয়ে গিয়েছিল।

মেরুন শাড়িটা বৃষ্টির পানিতে ভারী হয়ে উঠেছে।

খোলা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পিঠজুড়ে ছড়িয়ে আছে।

ঠান্ডা বাতাস আর বৃষ্টির ছোঁয়ায় তার মনটা অদ্ভুতভাবে হালকা লাগছে।

অনেকদিন পর সে হাসছে।

মন খুলে হাসছে।

তাই খেয়ালই করেনি—

ছাদের দরজার কাছে একজন মানুষ নীরবে দাঁড়িয়ে আছে।

অন্ধকারে তার অবয়ব স্পষ্ট নয়।

কিন্তু তার চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে আনিকার উপর।

সেই মানুষটা তাজ।

মাত্র দশ মিনিট আগে বাড়ি ফিরেছে সে।
কিন্তু যেভাবে ফিরেছে, আগে কখনও এমন ফিরেনি।

তার শার্ট ভেজা।
চুল এলোমেলো।
চোখ দুটো লালচে।
মুখভর্তি ক্লান্তি আর ভাঙনের ছাপ।
আজকের রাতটা তার জীবনের সবচেয়ে নির্মম রাতগুলোর একটি।

যে মানুষটাকে সে নিঃশর্ত বিশ্বাস করেছে, বছরের পর বছর ভালোবেসেছে, আজ নিজের চোখে তার অন্য এক রূপ দেখেছে।

একটা হোটেল রুম।
একটা বন্ধ দরজা।
আর দরজার ওপাশে এমন এক সত্য, যা সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি।
সেই দৃশ্য এখনও বারবার ভেসে উঠছে তার চোখের সামনে
তার সমস্ত বিশ্বাস, সমস্ত স্বপ্ন যেন মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
তাজ দুহাত মুঠো করে দাঁড়িয়ে রইল।
তার ভেতরে রাগ আছে।
কষ্ট আছে।
কিন্তু এই মুহূর্তে ছাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা আনিকাকে দেখে সবকিছু যেন কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেল।

অনেকদিন পর সে আনিকাকে এতটা স্বাভাবিক দেখছে।

মেয়েটা হাসছে।

বৃষ্টির সঙ্গে খেলছে।

যেন পৃথিবীর কোনো দুঃখ তাকে ছুঁতে পারছে না।

তাজের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি জন্ম নিল।

সে বুঝতে পারল না সেটা কী।
ঠিক তখনই আকাশ কাঁপিয়ে প্রচণ্ড বজ্রপাত হলো।
চমকে উঠে আনিকা ঘুরে দাঁড়াল।
আর সঙ্গে সঙ্গে তার হাসি মিলিয়ে গেল।
কারণ কয়েক হাত দূরে তাজকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল সে।
তাজও স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। কেমন নেশালো দৃষ্টি তাতে।
দুজনের মাঝে শুধু বৃষ্টির পর্দা।
কয়েক মুহূর্ত কেউ কোনো কথা বলল না।
বাতাসে অদ্ভুত এক নীরবতা।

শেষ পর্যন্ত আনিকাই প্রথম বলল,

— আপনি... এখানে?

তার কণ্ঠে বিস্ময় স্পষ্ট।

তাজ ধীরে ধীরে চোখ সরিয়ে আকাশের দিকে তাকাল।

— হুম। আমি এখানে। কেন আসতে পারি না আমি।

— না মানে সবাই তো যশোর চলে গেছে?

—কেন..??

আনিকা ইতস্তত করে বলল --
— আপনার নানি মারা গিয়েছে। আপনাকে সবাই কতো কল দিলো ফোনটা বন্ধ ছিল তাই আপনাকে জানাতে পারিনি তাই সকালে চলে গিয়েছে। আ আপনি যাবেন না।

—তাজ নেশার ঘোরে শুনলো নানীর মৃত্যুর কথা। বুকের মাঝে কেমন চিনচিনে ব্যথা অনুভব করলো সে। নেশা নেশা কন্ঠে বলল
— বাড়িতে তুমি একা?

আনিকা মাথা নাড়ল।

আবার নীরবতা।

বৃষ্টির শব্দ যেন আরও জোরে শোনা যাচ্ছে।

আনিকা এবার খেয়াল করল—

তাজের চেহারা অস্বাভাবিক।

চোখ লাল।

মুখ শক্ত।

মনে হচ্ছে ভেতরে ভেতরে কোনো ভয়ংকর যুদ্ধ লড়ছে সে।

আনিকার ভ্রু কুঁচকে গেল।

— আপনার কী হয়েছে?

তাজ কিছুক্ষণ উত্তর দিল না।

তারপর ধীরে ধীরে বলল,

— আজ একটা সত্য জেনেছি।

((( তার চোখের সামনে ভেসে উঠল কিছুক্ষণ আগের ঘটনা। তাজ নির্ধারিত হোটেলে গিয়ে সাথী কে একটা ছেলের সাথে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দরেছে।ছেলেটাকে তার চেনে।সাথীর ফেনে এই ছেলে অনেক ছবি রয়েছে। তাজ যতবার এই ছেলের সম্পর্কে জানতে চেয়েছে সাথী একটাই উত্তর দিয়েছে ছেলেটা তার ফ্রেন্ড। টাকার লোভে সাথী আর তার সে ফ্রেন্ড মিলে তাজকে প্রেমের জালে ফাসিয়েছিল।

তাজ পুলিশ নিয়ে হোটেলে গিয়ে সাথী কে আর সাথীর বয়ফ্রেন্ডকে পুলিশের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে।

মনের কষ্টে, তাজ সেখন থেকে একটা ভারে গিয়ে ড্রিংক করে মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরেছে.... ))

আনিকা প্রশ্ন সূচক বৃষ্টিতে তাজের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু তাজ নিশ্চুপ ,, কেমন ঠলে পড়ছে,,,

বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তখনও নীরবে ঝরে পড়ছিল।

আর ছাদের সেই নির্জন রাতের বাতাসে জমে উঠছিল এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

#চলবে,,,

08/07/2026

#আবুজ_পাখির_বায়না
#লেখনীতে_লামিয়া_খান_লামহা
#পর্ব_২৪

⭕কপি করা কঠোর ভাবে নিষেধ 🚫❌

ভোরের আলো ধীরে ধীরে হাসপাতালের করিডোরে ছড়িয়ে পড়লো।

সূর্য ওঠার সাথে সাথে খান বাড়ির সবাই আবার হাসপাতালে এসে পৌঁছাল।

রেজা খান, কবির খান, লিপি বেগম, রেখা বেগম— সবাই আইসিইউর সামনে এসে দাঁড়াল। সারারাত খান বাড়ির কারো ঘুম হয়নি আনিকার চিন্তায়।

রাহাকে আনিকার রুমে রেখে রাজ নিজের ক্যাবিনে গিয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে।বেরিয়ে এসে তাদের সঙ্গে যোগ দিল।

সবাই একসাথে এসে থমকে গেল আইসিইউর কাঁচের দরজার সামনে।

ভেতরের দৃশ্যটা দেখে কয়েক সেকেন্ড কেউ কথা বলতে পারল না।

কাঁচের ওপাশে—

আনিকা আর রাহা।

দু’জন বোন একে অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে, গভীর ঘুমে।

রাহার মাথা আনিকার বুকে।

আনিকার এক হাত ধীরে ধীরে রাহার চুলে।

দু’জনের মুখেই ক্লান্তি, কিন্তু সেই ক্লান্তির ভেতরেও আছে এক ধরনের শান্তি।

রাজ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তার চোখে অবাক হওয়া স্পষ্ট।

সে ভেবেছিল, রাহা হয়তো কিছুক্ষণ থেকে বেরিয়ে যাবে।

কিন্তু সে যে এভাবে একজন রোগীর বিছানায় ছোট বাচ্চার মতো ঘুমিয়ে পড়বে— এটা সে একদমই ভাবেনি।

তার মুখে হালকা একটা মলিন হাসি ফুটে উঠল।

— পাগলি মেয়ে…

ফিসফিস করে বলল সে।

অন্যদিকে তাজ কাঁচের ওপাশে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ।

আনিকার শান্ত মুখটা দেখে তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ব্যথা অনুভব হলো।

এটা শুধু চাচাতো বোন হিসেবে নয়—

কোথাও যেন আরও গভীর কিছু।

সে চোখ নামিয়ে নিল।

এক মুহূর্তের জন্য নিজের অনুভূতিটা বোঝার চেষ্টা করল, কিন্তু কিছুই পরিষ্কার হলো না।

শুধু একটা কথা বারবার মনে হচ্ছিল—

এই মেয়েটা ভাঙলে পুরো পরিবার ভেঙে যায়।

রেজা খান ধীরে ধীরে কাঁচের দিকে তাকিয়ে কাঁপা গলায় বললেন,

— আলহামদুলিল্লাহ… ওরা একটু শান্ত হয়েছে।

লিপি বেগম চোখ মুছলেন।

— আল্লাহ যেন আমার মেয়েটাকে পুরোপুরি ভালো করে দেন।

করিডোরে সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।

কেউ শব্দ করছে না।

শুধু কাঁচের ওপাশে দুই বোনের ঘুমন্ত শান্ত মুখ দেখে সবার ভেতরের অস্থিরতাটা একটু একটু করে কমে আসছে।

কারণ এই মুহূর্তে—

সব ব্যথার মাঝেও, এটাই সবচেয়ে শান্ত দৃশ্য।রাজ কাচের দরজা ঠেলে কেবিনের ভেতরে ঢুকল। আরেকবার আনিকাকে ভালো করে পরীক্ষা করে দেখল সে। মেয়েটার শারীরিক অবস্থা এখন স্থিতিশীল। প্রেসার, পালস—সবকিছু স্বাভাবিক। শুধু অতিরিক্ত দুর্বলতার কারণে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে।

কিন্তু তার দৃষ্টি গিয়ে থামল আনিকার পাশেই।

রাহা বিছানার একপাশে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। এক হাত এখনও আনিকার হাতের উপর রাখা।

দৃশ্যটা দেখে রাজের ভ্রু কুঁচকে গেল।

"এই মেয়েটার মাথায় কি সামান্যতম বুদ্ধিও নেই?"

একজন রোগীর পাশে এভাবে শুয়ে থাকার মানে হয়?

রাজ এগিয়ে গিয়ে রাহাকে ডাকতে চাইল। কিন্তু পরক্ষণেই থেমে গেল।

সারারাত এক মুহূর্তও চোখ বন্ধ করেনি মেয়েটা।

কতবার তাকে খেতে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু খায়নি। শুধু কেঁদেছে। কখনো আনিকার মাথায় হাত বুলিয়েছে, কখনো তার হাত ধরে বসে থেকেছে।

রাহা বরাবরই রাগী, জেদি আর বদমেজাজি।

তার মুখে মিষ্টি কথা শোনা যায় না বললেই চলে।

কিন্তু গত রাতের পর রাজ বুঝতে পারছে, মেয়েটার রাগের আড়ালে একটা নরম হৃদয় লুকিয়ে আছে।

ঘুমন্ত অবস্থায় মুখটা এতটাই নিষ্পাপ লাগছে যে তাকে ডেকে তোলার ইচ্ছেটা আর হলো না।

দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিঃশব্দে কেবিন থেকে বেরিয়ে এল সে।

বাইরে করিডোরে খান পরিবারের সবাই অপেক্ষা করছে।

বৃদ্ধ করম আলী খান আর কোহিনুর বেগমও অসুস্থ শরীর নিয়ে হাসপাতালে চলে এসেছেন। সারা রাত কারও চোখে ঘুম ছিল না।

রাজকে বের হতে দেখেই সবাই উঠে দাঁড়াল।

রেজা খান উৎকণ্ঠিত গলায় জিজ্ঞেস করলেন,

— কেমন আছে আমার মেয়েটা?

রাজ আশ্বস্ত করে বলল,

— আলহামদুলিল্লাহ, এখন কোনো ভয় নেই। শরীর দুর্বল, তাই ঘুমাচ্ছে। কয়েকদিন বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।

তার কথা শুনে সবার বুক থেকে যেন বড় একটা পাথর নেমে গেল।

কোহিনুর বেগম দু'হাত তুলে ফিসফিস করে বললেন,

— আল্লাহর হাজার শুকরিয়া।

একপাশে ঈশান, ধূসর আর হিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল।

গত রাতেই ঈশান ফোন করে বেল্লাল খান, জিহাদ খান এবং সালমা বেগমকে পুরো ঘটনা জানিয়েছিল। তারা ইতিমধ্যেই রওনা দিয়েছেন। যে কোনো সময় হাসপাতালে পৌঁছে যাবেন।

হাসপাতালের পরিবেশ এখনও ভারী আর থমথমে।

ঠিক তখনই করিডোরে এসে উপস্থিত হলেন শাহিন সাহেব আর শিনাতু।

শিনাতুকে দেখামাত্র হিয়া আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ছুটে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল।

— .. আমি খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম...

শিনাতু তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

— কিছু হবে না। আনিকা আপু ঠিক আছে এখন।

গত রাতে শাহিন সাহেব অনেক দেরিতে বাসায় ফিরেছিলেন। তখন শিনাতু বাবার কাছে এত রাত হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি রাহার মনিরের ছেলেকে মারার ঘটনাসহ পুরো বিষয়টা খুলে বলেছিলেন।

সব শুনে তখনই খান বাড়িতে যেতে চেয়েছিল শিনাতু। নিজের বান্ধবীদের জন্য ভীষণ চিন্তা হচ্ছিল তার।

কিন্তু গভীর রাত হওয়ায় শাহিন সাহেব তাকে বুঝিয়ে সকালে নিয়ে আসার কথা বলেন।

সকালে খান বাড়িতে গিয়ে তারা জানতে পারেন বাড়িতে কেউ নেই। সবাই হাসপাতালে।

আর আনিকা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে—এই খবর শুনে তারা এক মুহূর্তও দেরি না করে সোজা হাসপাতালে চলে আসেন।

শাহিন সাহেব এবার রেজা খানের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,

— রেজা ভাই, আপনি একদম চিন্তা করবেন না। থানার বিষয়টা পুরোপুরি আমার উপর ছেড়ে দিন। আমি নিজে সব দেখব।

একটু থেমে আবার বললেন,

— আর মিডিয়ার কেউ যেন বিষয়টা জানতে না পারে, সেদিকেও আমি খেয়াল রাখব। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আনিকার সুস্থ হয়ে ওঠা।

রেজা খান কৃতজ্ঞ চোখে তার দিকে তাকালেন।

শাহিন সাহেব নিচু গলায় আরও বললেন,

— মনির সাহেব ইতিমধ্যেই অনেক দৌড়ঝাঁপ শুরু করে দিয়েছেন। কে বা কারা তার ছেলের এই অবস্থা করেছে সেটা জানার জন্য বারবার থানায় যাচ্ছেন, বিভিন্ন জায়গায় চাপও দিচ্ছেন।

তারপর আশ্বস্ত করে বললেন,

— তবে এসব নিয়ে আপনাদের ভাবতে হবে না। আইনগত দিক আমি সামলে নেব।

রেজা খান গভীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

গত এক রাতেই যেন তিনি অনেকটা বুড়িয়ে গেছেন।

তখন কবির খান এগিয়ে এসে ছোট ভাইয়ের কাঁধে হাত রাখলেন।

— এত চিন্তা করিস না, রেজা।

রেজা খান চুপচাপ তার দিকে তাকালেন।

কবির খান শান্ত গলায় বললেন,

— সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। মনিরের ছেলেটা সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। অন্যায়ের একটা ফল থাকেই। আজ না হয় কাল, সেটা তাকে ভোগ করতেই হতো।

তিনি একবার কেবিনের দিকে তাকিয়ে আবার বললেন,

— এখন আমাদের প্রথম কাজ আনিকাকে সুস্থ করে তোলা। বাকি সব পরে দেখা যাবে।

কবির খানের কথায় উপস্থিত সবাই নীরবে সম্মতি জানাল।

করিডোরে আবার নীরবতা নেমে এলো।

কাচের দরজার ওপারে ঘুমিয়ে থাকা দুই বোনকে দেখছিল সবাই।

একজন মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসেছে।

আরেকজন সারারাত চোখের পানি ফেলে তাকে আগলে রেখেছে।

সেই দৃশ্য দেখে উপস্থিত প্রত্যেকের মনেই একই কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল—

রক্তের সম্পর্কের টান কখনো কখনো হাজার কথার চেয়েও বেশি শক্তিশালী।আনিকার ঘুম ভাঙার পর থেকে পুরো কেবিনের পরিবেশটাই বদলে গেল।

এতদিনের দুশ্চিন্তা, আতঙ্ক আর কান্নার মাঝে যেন একটু স্বস্তির আলো ফিরল।

আনিকা ধীরে ধীরে উঠে বসতেই সবাই তার চারপাশে জড়ো হলো।

সবার মুখের দিকে একবার তাকিয়ে তার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।

গত কয়েকদিনে কতটা কষ্ট দিয়েছে সে সবাইকে, সেটা এখন স্পষ্ট বুঝতে পারছে।

চোখে পানি নিয়ে সে বলল,

— আমি... আমি সবার কাছে ক্ষমা চাইছি।

কেবিনে নীরবতা নেমে এলো।

আনিকা মাথা নিচু করে কাঁপা গলায় বলল,

— আমি খুব বড় ভুল করেছি। নিজের কষ্টে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। একবারও ভাবিনি আমার জন্য তোমাদের কী অবস্থা হবে। আমাকে ক্ষমা করে দাও তোমরা।

কথা শেষ হতেই তার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

আনন্য বেগম আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।
এগিয়ে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললেন,

— আর কখনো এমন কথা মুখে আনবি না। তোকে ছাড়া আমি বাঁচব কীভাবে?

কোহিনুর বেগম চোখ মুছতে মুছতে বললেন,

— মানুষ ভুল করে দিদিভাই, কিন্তু জীবন শেষ করে দেওয়া কোনো সমাধান নয়। আল্লাহ যতদিন জীবন দিয়েছেন, ততদিন ধৈর্য ধরতে হয়।

করম আলী খান গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,

— জীবনে হাজার ঝড় আসবে। কিন্তু সাহসীরা লড়াই করে, পালিয়ে যায় না

কবির খান মৃদু হেসে বললেন,

— সমস্যা যত বড়ই হোক, পরিবারের সঙ্গে ভাগ করে নিলে তার ওজন অর্ধেক হয়ে যায়। পরেরবার কোনো কষ্ট হলে একা সহ্য করার চেষ্টা করবে না মামুনি।

বেল্লাল খান বললেন,

— তুই আমাদের সবার আদরের মেয়ে। তোর চোখে পানি দেখলে আমাদেরও কষ্ট হয়।

জিহাদ খান মাথায় হাত রেখে বললেন,

— জীবনে ভুল করেছিস, সেটা বুঝতে পেরেছিস। এটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার। তুই একদম টেনশন নিস না ঐ মানিকের এমন ব্যবস্থা করব যাতে সারা জীবনের জেল থেকে বের হতে না পারে।

রাজ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

— ডাক্তার হিসেবে একটা কথা বলব। শরীরের অসুখ যেমন চিকিৎসা লাগে, মনের কষ্টেরও চিকিৎসা লাগে। নিজের অনুভূতি কখনো চেপে রাখবে না।

হিয়া সঙ্গে সঙ্গে বলল,

— আর আমাদের কাছে কিছু লুকাবে না আপু।

ঈশান হেসে বলল,

— আবার যদি এমন কিছু করার চিন্তা করিস, আগে আমাকে জানাস। তারপর দেখবি আমি কী করি!

তার কথা শুনে সবাই হালকা হেসে উঠল।

অনেকদিন পর আনিকার মুখেও ছোট্ট একটা হাসি ফুটে উঠল।

আর রাহা?

সে সবার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল।

হঠাৎ এগিয়ে এসে গম্ভীর মুখে বলল,

— আরেকবার এমন কিছু করলে আগে আমি তোকে মেরেই ফেলব।

কথাটা শুনে সবাই অবাক হয়ে গেল।

পরক্ষণেই রাহার চোখ ভিজে উঠল।

সে আনিকাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।

— আমাকে এভাবে ভয় পাইয়ে দিবি না আর কখনো...

আনিকা বোনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

— দিব না।

এরপরের চার দিন হাসপাতালে সবার ভালোবাসা আর যত্নের মধ্যেই কেটে গেল।

ডাক্তারদের পরামর্শ অনুযায়ী বিশ্রাম, ওষুধ আর নিয়মিত খাবারের কারণে আনিকার শারীরিক অবস্থা দ্রুত উন্নতি হতে লাগল।

চার দিন পর—

সকালে হাসপাতালের কেবিনে ছাড়পত্রের কাগজপত্র প্রস্তুত হলো।

আজ আনিকা বাড়ি ফিরবে।

খবরটা শুনে খান বাড়ির সবাই যেন ঈদের আনন্দ পেল।

রাহা তো সকাল থেকেই ব্যাগ গুছিয়ে বসে আছে।

হিয়া, ধূসর, ঈশান সবাই ব্যস্ত।

হাসপাতাল থেকে বের হওয়ার সময় আনিকা একবার পেছনে তাকাল।

এই কয়েকদিনের ভয়ংকর স্মৃতিগুলো যেন এখানেই রেখে যেতে চায় সে।

বাইরে এসে দেখে পুরো খান পরিবার অপেক্ষা করছে।

কোহিনুর বেগম এগিয়ে এসে তার কপালে চুমু খেয়ে বললেন,

— চল দিদি ভাই, এবার নিজের বাড়িতে ফিরে যাই।

আনিকার চোখ ভিজে উঠল।

পরিবারের সবাইকে ঘিরে থাকতে দেখে তার মনে হলো—

জীবনে যত অন্ধকারই আসুক না কেন, পাশে যদি নিজের মানুষগুলো থাকে, তাহলে নতুন করে বাঁচার শক্তি পাওয়া যায়।

এরপর সবার হাসি-আনন্দ আর দোয়ার মাঝে আনিকাকে নিয়ে গাড়ির বহর রওনা দিল খান বাড়ির উদ্দেশ্যে। ❤️

🏡হাসপাতাল থেকে ফেরার পর কেটে গেছে বেশ কয়েক সপ্তাহ।

খান বাড়ির জীবন ধীরে ধীরে আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে শুরু করেছে।

তবে সবকিছু স্বাভাবিক হলেও কিছু অদৃশ্য পরিবর্তন যেন থেকে গেছে সবার মাঝে।

সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে আনিকার জীবনে।

সেদিনের ঘটনার পর থেকে সে একদিনের জন্যও কলেজে যায়নি।

প্রথম দিকে সবাই ভেবেছিল কয়েকদিন বিশ্রাম নিলে হয়তো নিজে থেকেই আগের মতো হয়ে যাবে।

কিন্তু দিন পেরিয়ে সপ্তাহ চলে গেলেও আনিকা বাড়ির গণ্ডি ছেড়ে কোথাও যেতে চায় না।

বেশিরভাগ সময় নিজের ঘরেই থাকে।

কখনো বই পড়ে, কখনো ডায়েরি লিখে, আবার কখনো জানালার পাশে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো—

খান বাড়ির কেউ তাকে জোরও করছে না।

রাজ ডাক্তার হিসেবে সবাইকে পরিষ্কার বলে দিয়েছে,

— ওকে সময় দিতে হবে। জোর করলে উল্টো ক্ষতি হবে।মানসিকভাবে ট্রমার ভিতর আছে। ধীরে ধীরে নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যাবে।

তাই পরিবারও ধৈর্য ধরেছে।

কোহিনুর বেগম, রেখা বেগম, অনন্য বেগম, লিপি বেগম, সালমা বেগম।—সকলেই নিজেদের মতো করে আনিকার পাশে থাকার চেষ্টা করছেন।

অন্যদিকে বাড়ির পরিবেশে আরেকটা অস্বস্তিকর দূরত্ব তৈরি হয়েছে।

রেখা বেগম এখনও তাজের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেন না।

সেদিনের ঘটনার পর তার মনে যে অভিমান জন্মেছে, সেটা এখনও কমেনি।
মায়ের কাছে সন্তান কখনো ভুল হতে পারে না।
কিন্তু সেদিন তাজ যেভাবে একটা অচেনা মেয়ের জন্য নিজের পরিবারের কথা, আনিকার অবস্থার কথা উপেক্ষা করেছিল—সেটা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি তিনি। তার তিন ছেলের দুই ছেলে রাস্তা-ঘাটে মেয় নিয়ে ঘোরে। বড় হয়েছে তাই বলে এমন চরিত্র হীনা মেয়োর সাথে ঘুরবে। এমন শিক্ষা সে তার ছেলেদের দেয়নি।

রেখা বেগম মনে মনে ভাবেন,

"ভালোবাসা অপরাধ নয়। কিন্তু মানুষটাকে না জেনে, না বুঝে এতটা বিশ্বাস করা কি ঠিক?"

সেই ছবিগুলো এখনও তার চোখের সামনে ভাসে।

ছবিগুলো সত্যি না মিথ্যা তিনি জানেন না।

কিন্তু সেগুলো যে তার মনে গভীর সন্দেহের বীজ বপন করেছে, সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই।

তাই তাজ সামনে এলেও তিনি প্রয়োজন ছাড়া কথা বলেন না।

তাজও বিষয়টা বুঝতে পারে।

মায়ের নীরবতা তাকে প্রতিদিন একটু একটু করে কষ্ট দেয়।

তবু সে কোনো অভিযোগ করে না।

কারণ সে জানে, এই অভিমানের পেছনে মায়ের ভালোবাসাই কাজ করছে।

তবে তাজ নিজেও শান্তিতে নেই।

সাথীকে নিয়ে তার মনের ভেতর শুরু হয়েছে এক অদ্ভুত যুদ্ধ।

একদিকে এতো বছরের ভালোবাসা আর বিশ্বাস।

অন্যদিকে রাহার বলা কথা আর সেই রহস্যময় ছবিগুলো।

কোনটা সত্যি?কোনটা মিথ্যা?

সে নিজেও উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না।

অবশেষে তাজ সিদ্ধান্ত নিয়েছে—

কাউকে বিশ্বাস করার আগে সত্যিটা নিজেই খুঁজে বের করবে।

তাই গোপনে অফিসের কয়েকজন বিশ্বস্ত লোককে দায়িত্ব দিয়েছে সাথীর ওপর নজর রাখার জন্য।

তারা সাথীর চলাফেরা, বন্ধুবান্ধব, যোগাযোগ—সবকিছু খতিয়ে দেখছে।

তাজ কাউকে কিছু জানায়নি।

এমনকি রাজ, ধূসর কিংবা ঈশানকেও না।

প্রতিদিন রাতে রিপোর্ট আসে।

আর তাজ একা বসে সেগুলো পড়ে।

কিন্তু এখনও পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যা নিশ্চিত করে বলতে পারে সাথী নির্দোষ কিংবা দোষী।

ফলে তার অস্থিরতা আরও বেড়ে যাচ্ছে।

রাত গভীর হলে মাঝে মাঝে নিজের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে সে।হাতে জ্বলন্ত সিগারেট।চোখে অজস্র প্রশ্ন।মনে হয় যেন দুই দিক থেকে টানছে তাকে।

একদিকে হৃদয় বলছে—"সাথী এমন হতে পারে না।"

অন্যদিকে যুক্তি বলছে—

"সত্যিটা জানার আগ পর্যন্ত কাউকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করো না।"

সেদিনও গভীর রাতে তাজ বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল।

হঠাৎ তার ফোনে একটি মেসেজ ঢুকল।

মেসেজটা এসেছে সেই লোকদের একজনের কাছ থেকে।

সঙ্গে একটি ছবি।

ছবিটা দেখেই তাজের চোখ মুহূর্তে সংকুচিত হয়ে গেল।

চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।

কারণ ছবিতে দেখা যাচ্ছে—

সাথী এমন একজন মানুষের সঙ্গে দেখা করছে, যাকে তাজ খুব ভালো করেই চেনে...

আর সেই মানুষটাকে সেখানে দেখার কোনো কারণ থাকার কথা নয়।

#চলবে...।

08/07/2026

#আবুজ_পাখির_বায়না
#লেখনীতে_লামিয়া_খান_লামহা
#পর্ব_২৩

হাসপাতালের আইসিইউর বাইরে উদ্বিগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছে খান বাড়ির সবাই।

তাজ করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখ বারবার আইসিইউর দরজার দিকে চলে যাচ্ছে। কেন যেন বুকের মাঝে শুক্ষু একটা চিঞ্চিনে ব্যথা অনুভব করছে সে কেন হচ্ছে এমনটা। একদম জানা নেই তাজের।আনিকার জন্য হতে পারে আমি কাকে নিজের ছোট বোনের মতই দেখে,,
লম্বা একটা নিঃশ্বাস নিয়ে নিজের মনকে বোঝালো তাজ বড় ভাই হয়ে ছোট বোনের জন্য একটু উদ্বেগ হওয়া স্বাভাবিক এ বিষয়ে আর বেশি মাথা ঘামালো না সে ।

রাহা আর হিয়া পাশাপাশি বসে আছে। দুজনের মুখেই স্পষ্ট দুশ্চিন্তার ছাপ।

রেজা খান চুপচাপ বসে আছে।অতিরিক্ত শোক এ মানুষ পাথর হয়ে যায় তার অবস্থা হয়েছে তেমনি। আর কবির খান সবাইকে ধৈর্য ধরার কথা বলছেন।

এদিকে আইসিইউর ভেতরে রাজ নিজেই আনিকার চিকিৎসা করছে। রক্তক্ষরণ বন্ধ করা হয়েছে, তবে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে দ্রুত রক্তের প্রয়োজন হয়।

রিপোর্ট চেক করে জানা গেল, রাহার সঙ্গে আনিকার ব্লাড গ্রুপ মিলে গেছে।

কথাটা শুনেই রাহা এক মুহূর্ত দেরি করল না।

— আমি রক্ত দেব।

তার কণ্ঠ দৃঢ় হলেও চোখ ভেজা।

কেউ আপত্তি করার আগেই সে টেস্টের জন্য চলে গেল।

সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর রাহা আনিকার জন্য রক্ত দিল।

রক্ত দেওয়ার সময়ও তার চোখে শুধু বড় বোনের মুখ ভাসছিল।

মনে মনে সে বারবার দোয়া করছিল,

"আল্লাহ, আমার আপুটাকে সুস্থ করে দিন।"

রক্ত দেওয়ার পর রাজ আবার আইসিইউতে ফিরে গিয়ে আনিকার চিকিৎসায় মনোযোগ দিল।

কিছুক্ষণ পর সে বাইরে বেরিয়ে এলো।

সবাই একসঙ্গে তার দিকে তাকালো।

রাজ মাস্ক খুলে ক্লান্ত গলায় বলল,

— আপাতত বিপদ কেটে গেছে। রক্ত দেওয়া হয়েছে, শরীরও চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছে। তবে এখনও জ্ঞান ফেরেনি। আগামী ২৪ ঘণ্টা অবজারভেশনে রাখতে হবে।

কথাটা শুনে সবার বুক থেকে যেন একটা ভার নেমে গেল।

— আলহামদুলিল্লাহ...

ফিসফিস করে বললেন রেজা খান।

তবে স্বস্তির মাঝেও উদ্বেগ রয়ে গেল।

কারণ আনিকা এখনও আইসিইউতে, আর সবাই অপেক্ষা করছে তার চোখ খোলার।আনিকার অবস্থা স্থিতিশীল হওয়ার পর রাজ আইসিইউর বাইরে এসে সবার দিকে তাকাল।

ক্লান্ত গলায় বলল,

— আনিকা এখন বিপদমুক্ত। চিন্তার কিছু নেই। তবে ওকে পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। তোমরা সবাই বাড়ি গিয়ে একটু বিশ্রাম নাও।

সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি জানাল রেজা খান।

— আমি আমার মেয়েকে রেখে কোথাও যাব না।

কবির খান, তাজ, হিয়া, লিপি বেগম— কারোরই যেতে ইচ্ছে করছিল না।

রাজ এবার একটু কঠোর গলায় বলল,

— আমি এখানে আছি।কোনো সমস্যা হলে সঙ্গে সঙ্গে জানাব। তোমাদের সবাইকে বিশ্রাম নিতে হবে।
অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে শেষ পর্যন্ত সবাইকে রাজি করানো হলো।

রেজা খান যাওয়ার আগে একবার আইসিইউর কাঁচের ওপাশে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

তাজও কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেল।

হিয়া, লিপি বেগম, কবির খান— সবাই একে একে হাসপাতাল ছেড়ে চলে গেল।

তবে একজন রয়ে গেল।

রাহা।

রাজ তাকে দেখে বলল,

— তুমিও বাড়ি যাও।

রাহা মাথা নাড়ল।

— না।

— রাহা...আমি কোথাও যাচ্ছি না।

তার চোখ লাল হয়ে আছে।

— আপুর জ্ঞান না ফেরা পর্যন্ত আমি এখানেই থাকব।

রাজ কিছুক্ষণ রাহার ফ্যাকাশে মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর আর জোর করল না।

করিডোরের একপাশের চেয়ারে গিয়ে চুপচাপ বসে পড়ল রাহা।

আইসিইউর কাঁচের ভেতর অচেতন আনিকার দিকে তাকিয়ে তার বুকটা আবার মোচড় দিয়ে উঠল রাহার।
হাসপাতালের করিডোর ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে গেল।

রাত আরও গভীর হলো।

আইসিইউর বাইরে এখন শুধু রাজ আর রাহা।

দুজনই অপেক্ষা করছে—

কখন আনিকা চোখ খুলবে।ফজরের আজানের কিছুক্ষণ পর আনিকার জ্ঞান ফিরেছে।

খবর পেয়ে রাজ দ্রুত কেবিনে ঢুকেছিল। প্রয়োজনীয় চেকআপ করে, কিছু প্রশ্ন করে নিশ্চিত হলো যে আনিকা এখন আগের চেয়ে ভালো আছে।

ঠিক তখনই দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল রাহা।

রাজ একবার দুই বোনের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল, এখন তাদের একান্তে কথা বলা দরকার।

সে ধীরে বলল,

— আমি বাইরে আছি।

বলেই কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল।

কেবিনে নীরবতা নেমে এলো।

রাহা ধীরে ধীরে এগিয়ে বেডের পাশে গিয়ে দাঁড়াল।

কয়েক সেকেন্ড আনিকার দিকে তাকিয়ে রইল।

ফ্যাকাশে মুখ।হাতে ব্যান্ডেজ।দুর্বল শরীর।

দৃশ্যটা দেখেই আবার তার চোখ ভিজে উঠল।

সে কাঁপা গলায় বলল,

— আনি... কেন করলি এমন?

আনিকা মাথা নিচু করে রইল।

রাহা বিছানার পাশে বসে তার হাতটা ধরে ফেলল।

— যদি তোর কিছু হয়ে যেত? তখন আমার কী হতো?
তুই ছাড়া আমার কে আছে বল?

কথাগুলো বলার সময় তার গলা বারবার কেঁপে উঠছিল।

— ছোটবেলা থেকে সবকিছু তোকে নিয়েই।
আমার আনন্দ, আমার রাগ, আমার ঝগড়া...সবকিছুর মধ্যে তুই আছিস। আর তুই কিনা আমাকে একা রেখে চলে যেতে চাইলি?

শেষ কথাটা বলতেই রাহার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল।

আনিকা চুপচাপ শুনছিল।কী বলবে সে?আসলেই তো কোনো উত্তর নেই তার কাছে।তখন তার মাথা কাজ করছিল না।একদমই না।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে আনিকা ধীরে বলল,

— তখন আমার কিছুই মাথায় ছিল না রাহা।
শুধু মনে হচ্ছিল আমি শেষ হয়ে গেছি।

রাহা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

আনিকার চোখ ভিজে উঠল।

— একটা মেয়ের কাছে নিজের আত্মসম্মানের চেয়ে বড় কিছু হয় রাহু বল?

—বল?

রাহা চুপ।

আনিকা তিক্ত হাসল।

— মানিক নামের ওই গুন্ডাটা আমাকে কতদিন ধরে জ্বালাচ্ছে জানিস।প্রতিদিন ভার্সিটিতে বিরক্ত করত। আমি কাউকে কিছু বলিনি।
ভেবেছিলাম একদিন না একদিন থেমে যাবে।

তার গলা ধরে এলো।

— কিন্তু কাল...

আনিকা চোখ বন্ধ করল।

ঘটনাটা মনে পড়তেই শরীর কেঁপে উঠল।

— কাল ও আমাকে জোর করে তুলে নিয়ে যেতে চেয়েছিল।এত মানুষের সামনে... সবার সামনে...

কথাগুলো বলতে গিয়েও তার গলা আটকে যাচ্ছিল।

রাহার হাত শক্ত হয়ে উঠল।

— এমনকি...

আনিকার চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়ল।

আমার গায়ের ওড়নাটাও টেনে নিয়ে গিয়েছিল। সবাই দেখছিল।পুরো ভার্সিটি দেখছিল।কেউ হাসছিল, কেউ ভিডিও করছিল...আর আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম।অসহায়ের মতো।

কেবিনের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে এলো।

আনিকা ফুঁপিয়ে উঠল।
জানিস রাহা...
ওই মুহূর্তে মনে হচ্ছিল আমি মরে গেলেই বোধহয় ভালো হতো।এত অপমান নিয়ে কীভাবে বাঁচব আমি? কীভাবে সবার সামনে আবার দাঁড়াব?

রাহার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।

সে উঠে এসে আনিকার মাথাটা নিজের বুকে টেনে নিল।

— পাগলি একটা।

— মানুষের নোংরামির জন্য তুই নিজেকে শাস্তি দিবি?

— অপরাধ করেছে মানিক। লজ্জা পাওয়ার কথা ওর। তোর না।

আনিকা চুপচাপ কাঁদতে লাগল।

রাহা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
শুন, পৃথিবীর কেউ তোর সম্মান কেড়ে নিতে পারে না। কিছু নোংরা মানুষের কাজ তোর মূল্য কমিয়ে দেয় না। তুই আমার বোন। আমাদের পরিবারের গর্ব।
আর যারা তোকে কাঁদিয়েছে, তাদের বিচার হবে।

রাহার কণ্ঠে এবার দৃঢ়তা।

— কিন্তু আর কখনো এমন কিছু করার কথা ভাববি না।
কারণ তোর কিছু হলে সবচেয়ে বেশি কষ্ট আমরা পাব।
আমি পাব।

আনিকা চোখ মুছে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

তারপর ফিসফিস করে বলল,
— সরি বনু। বাড়ির সকলে হয়তো আমার উপর অভিমান করেছে তান না বনু।

রাহা নাক টেনে বলল,

— না সবাউ তো তোকে আনেক ভালোবাসে। একটু আগে রাজ বাইয়া সবাইকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছে। তুই চিন্তা করিস না সবাই কে সরি বসে দিস। তোর তো সকলের আদরের তুই একবার সরি বললে ক্ষমা করে দিবে।


কথাটা শুনে কান্নার মাঝেও আনিকার ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে উঠল।

আর অনেকক্ষণ পর প্রথমবারের মতো তার মনে হলো
হয়তো সে একা নয়।রাহার কথা শুনে আনিকা চুপ হয়ে গেল।

তার বুকের ভেতরটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।

সে ভাবছিল, নিজের কষ্টে অন্ধ হয়ে গিয়ে একবারও ভাবেনি তার এই সিদ্ধান্তে কতজন মানুষ ভেঙে পড়বে।
পুরো পরিবার উদ্বেগে রাত কাটিয়েছে।

আর সে?

সে শুধু নিজের কষ্টটাই দেখেছিল।
আনিকার চোখ বেয়ে নীরবে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।

মনে হচ্ছিল নিজের কাছেই সে অপরাধী।

কাঁপা গলায় সে বলল,

— আমি খুব খারাপ, তাই না?

রাহা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।

— না।

— তুই খারাপ না।

— তুই শুধু অনেক বেশি কষ্ট পেয়েছিলি।

আনিকা ঠোঁট কামড়ে চোখ নামিয়ে নিল।

তার ভেতরের অপরাধবোধটা আরও বেড়ে গেল।

— আমার জন্য সবাই কষ্ট পেল...

কথা বলতে বলতে তার গলা ধরে এলো।

রাহা ধীরে ধীরে তার হাতটা চেপে ধরল।

— হ্যাঁ, কষ্ট পেয়েছি।

— কারণ আমরা তোকে ভালোবাসি।

আনিকা কিছু বলল না।

সে শুধু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল—

আর কখনো নিজের কষ্টের কাছে এতটা হার মানবে না।

কারণ তার জীবন শুধু তার একার নয়।
তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার পরিবার, তাদের ভালোবাসা, তাদের স্বপ্ন, তাদের হাসি-কান্না।

আর সেই ভালোবাসার মূল্য সে আর কখনো ভুলে যাবে না।রাহা হঠাৎ একটু ছোট্ট গলায় বলল,

— আপু… সারারাত ঘুম হয়নি আমার।

— আমি তোর পাশে একটু শুতে দিবি?

আনিকা এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকল।

তারপর খুব ধীরে, ক্লান্ত কিন্তু স্নেহভরা হাসি দিল।

— পাগলি।

বেড বড় হওয়ায় দু’জনেই এক পাশে একটু গুছিয়ে শুয়ে পড়ল।

আইসিইউ কেবিনে তখন বেশ শান্ত পরিবেশ।

ফরজ হওয়ার পর ডাক্তার-নার্সদের ব্যস্ততাও কিছুটা কম।

দু’জন বোন একসাথে শুয়ে আছে।

রাহা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আনিকাকে জড়িয়ে ধরল।

তারপর ফিসফিস করে বলল,

— তুই জানিস…

— আমি আজ মানিককে খুব মেরেছি।

আনিকা চোখ বড় করে তাকাল।

— কী?

রাহা একটু গর্ব আর রাগ মিশিয়ে বলল,

— যে হাত দিয়ে তোকে ছুঁতে গিয়েছিল…

— সেই হাতটা ভেঙে দিয়েছি আমি।

এক মুহূর্ত নিস্তব্ধতা।

আনিকা অবাক হয়ে রাহার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে তার ঠোঁটে এক ধরনের অস্থির হাসি ফুটে উঠল—অবাক, অবিশ্বাস আর চিন্তার মিশ্রণ।

— রাহা…

রাহা চোখ ছোট করে বলল,

— কী? এতো প্যানিক করসিস কেন এটা তো প্রাপ্যই ছিল।

আনিকা মাথা নাড়ল, কিন্তু চোখে তখনও বিস্ময়।

— তুই পাগল হয়ে গেছিস নাকি?

রাহা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

— না আপু।
তুই আমার আপু।আর তোর গায়ে কেউ হাত দিলে আমি হাত ভেঙেই থামব।

আনিকা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে রাহার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।

চোখে তখন জল, কিন্তু মুখে হালকা হাসি।

— পাগলি একটা…

— এত রাগ কই রাখিস তুই?

রাহা চোখ বন্ধ করে বলল,

— তোর মাথায়ে রাখি।

দুই বোন নিস্তব্ধ হয়ে রইল কিছুক্ষণ।

বাইরে ফজরের আলো একটু একটু করে বাড়ছে।

আর ভেতরে—

একজন বোনের কষ্ট আরেকজন বোনের ভালোবাসায় ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে যাচ্ছে।রাহা ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ল আনিকার বুকে মাথা রেখে, দু’হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।

সারারাতের ক্লান্তি, ভয় আর কান্না শেষে শরীরটা আর সাড়া দিচ্ছিল না তার।

ঘুমের ভেতরেও সে যেন আনিকাকে ছাড়তে চাইছে না।

আনিকার শরীর থেকে আসছিল একটা শান্ত, পরিচিত গন্ধ—যেটা রাহার কাছে সবসময় নিরাপত্তার মতো লাগে।
তার সেই একমাত্র দুর্বল জায়গা, তার একমাত্র আশ্রয়—আনিকা।

আনিকা চুপচাপ শুয়ে রইল।

চোখ দুটো ধীরে ধীরে সিলিংয়ের দিকে স্থির হয়ে আছে।

মাথার ভেতর অনেক চিন্তা, অনেক অপরাধবোধ, অনেক ভয়—

কিন্তু শরীরটা এতটাই দুর্বল যে সেগুলোও আর ঠিকভাবে ধরে রাখতে পারছিল না।

সে এক হাত ধীরে ধীরে রাহার মাথায় রাখল।

আস্তে করে আদর করল।

কিছুক্ষণ পর আনিকার চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো।

ফজরের শান্ত আলো, হাসপাতালের নিস্তব্ধতা, আর বোনের উষ্ণ জড়িয়ে ধরা—

সব মিলিয়ে তার ক্লান্ত শরীরটাও আর লড়াই করল না।

ধীরে ধীরে তারও চোখ বন্ধ হয়ে এলো।

দুই বোন একসাথে, এক বিছানায়, একে অপরকে ধরে
ভয়, কষ্ট আর অস্থিরতার মাঝেও যেন একটু শান্তির ঘুমে ডুবে গেল।

#চলবে

⭕কপি করা কঠোর ভাবে নিষেধ 🚫❌

{অনেকদিন পরে গল্প দিলাম। আসলে গল্পগুলো কেউ পড়ে না পেইজে কোন রিস্ক নেই। তাই গল্প দিতে ভালো লাগে না। কিন্তু আমার মানসিক শান্তির জন্য আমি গল্প লিখি এবং গল্পগুলো আমার পেইজে আপলোড করি। আশা করি একদিন আমার গল্প সবার ভালো লাগবে}

Want your business to be the top-listed Beauty Salon in Chittagong?
Click here to claim your Sponsored Listing.

Category

Website

Address

Chittagong
BORGUNA