Broken Heart
I m depressed & want to be alone with my sorrows...r u depressed like me...?
01/10/2026
#বিরহ_বৃত্তান্ত
#পর্ব_৩৩
এই কনকনে শীতের মাঝে ঘুম থেকে উঠাটা ভারী যন্ত্রণার। গা থেকে উষ্ণ কম্বল সরিয়ে ঠান্ডা মেঝেতে পা রাখতে মুনের একটু বেশিই কষ্ট হয়। মাঝে মাঝে তো সে তাই নামতেই চায় না। আরেকটু বেশি ঘুমানোর জন্য তার সেকি আবদার! কিন্তু ওসবে যে তার মায়ের মন গলে না। ঠিক ঠিক তাকে টেনে তুলে বিছানা থেকে। ওয়াশরুমের ওই কুসুম গরম পানি দিয়ে হাত মুখ ধুইয়ে দেয়। তাতেও মেয়ের শীত লাগে, গা কাঁপে।
আজ রবিবার। স্কুল খোলা। অথচ মেয়েটাকে এখনো বিছানা থেকে উঠানো যাচ্ছে না। মেয়ের মা আর না পেরে এবার রেগে বসল। ধমক দিল স্বল্প আওয়াজে, 'তুমি কি উঠবে, মুন? নাকি মা তোমাকে বাড়িতে একা ফেলেই অফিসে চলে যাব?'
মুন চোখ বন্ধ রেখেই ঠোঁট উল্টাল। হাত পা ছুড়ে বোঝাল তার আজ চোখ মেলতে কষ্ট হচ্ছে ভারী। তাতে কী, ওসব কষ্টের ধার তার মা ধারে না। মেয়েটার এই স্কুল ফাঁকি দেওয়ার বাহানা হরহামেশাই চলে। মা তাই ওসব আর পোরোয়া করে না আজকাল। মেয়েকে টেনে উঠে বসাল। বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলল,
'তুমি না লক্ষী মেয়ে, আমার প্রিন্সেস, এমন বায়না করলে হয়? স্কুলে না গেলে কত পড়া মিস হয়ে যাবে, তখন তো পরীক্ষায়ও খারাপ করবে। এমন করে না, মা। এই তো কয়টা দিন, বার্ষিক পরীক্ষাটা শেষ হলেই একটা লম্বা ছুটি পেয়ে যাবে।'
'এবার ছুটিতে আমায় কোথায় নিয়ে যাবে, মা?'
'তুমি কোথায় যেতে চাচ্ছ?'
'সী-বিচে।'
'কক্সবাজার?'
'হ্যাঁ। নিয়ে যাবে, বলো?'
একটু সময় নিয়েই মায়ের জবাবটা এল, 'বেশ, যাব।'
মেয়েটা খুশি হয়ে গেল অমনি। হাত তালি দিয়ে খিলখিল করে হাসতে আরম্ভ করল। তার মা তাকে ধরে বলল, 'তবে আমাকেও একটা ওয়াদা দিতে হবে, বার্ষিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগ অবধি খুব মনোযোগ দিয়ে তোমাকে পড়াশোনাটা করতে হবে। একদম ফাঁকিবাজি করা যাবে না, কেমন?'
মেয়েটা মায়ের গালের সঙ্গে গাল ঘঁষে বলল, 'কোনো ফাঁকিবাজি করব না, মা। তোমার সব কথা শুনব।'
মা খুশি হয়ে মেয়ের গালে চুমু খেয়ে বলল, 'এবার তাহলে দ্রুত তৈরি হও। স্কুলের জন্য নয়তো দেরি হবে।'
মেয়েকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে নিজের অফিসে চলে গেল মেহেরুন। মুনের স্কুল থেকে তার অফিসটা বেশি দূরে নয়। যাতায়াতে বেশ সুবিধা বলেই তার খাটুনি আজকাল একটু কম হচ্ছে। অফিসে আজ সকালেই একটা মিটিং আছে। সেখানে আবার প্রেজেন্টেশনটা তারই। বিদেশী এক কোম্পানির সাথে তাদের এই ডিলটা। মেহেরুন গত এক সপ্তাহ ধরে এটা নিয়ে দিন রাত খেটেছে। কোনোভাবে ডিলটা কনফার্ম করাতে পারলেই তার প্রমোশোন নিশ্চিত।
'আপনার গায়ে আকাশী রংটা দারুণ মানায়, মিস মেহেরুন। মনে হয় যেন এক টুকরো স্বচ্ছ মেঘ আকাশ থেকে নেমে এসেছে।'
শেষবারের মতো স্লাইটগুলোতে চোখ বুলাচ্ছিল মেহেরুন। কথাটা কানে যেতেই কপালে ভাঁজ পড়ল তার। কন্ঠস্বরটা চেনা বলে আর চোখ তুলল না। ওভাবেই বলল, 'ধন্যবাদ। তবে এই মুহূর্তে আমাকে একটু একা ছেড়ে দিলে আমি বরং বেশি খুশি হব। একটু পরেই আমার মিটিং।'
'আমি জানি আপনি দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করবেন। তারপরেও অল দ্য বেস্ট। প্রমোশোনটা পেলেই কিন্তু ট্রিট চাই।'
না চাইতেও মেহেরুন হেসে বলল, 'জি, অবশ্যই।'
লোকটা চলে গেল সেখান থেকে। মেহেরুন বেশ জানে, ওই চোখগুলো কাঁচের দরজা ভেদ করে এখনো তাকেই দেখছে। আপাতত মিটিং এর চিন্তায় মেয়েটা আর ওদিকে মনোযোগ দিল না।
মিটিংটা শেষ হলো। মেহেরুন সত্যিই আজ দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেছে। অফিসের বসসহ সবাই আজ তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ডিলটাও কনফার্ম ইতোমধ্যে। মেহেরুনের খুশির অন্ত নেই। প্রমোশোনটা পেলে তার মাইনে বাড়বে। মেয়েটার ড্রয়িং এর প্রতি খুব ঝোঁক। প্রমোশোনটা পেলেই তাকে আগে ভালো একটা আর্ট স্কুলে ভর্তি করাবে। এরপর ভাইকেও কিছু হাত খরচ দিবে ভাবছে। আগে নিজের সংসার চালিয়ে মা-বাবাকে দিয়ে তার আর হাতে বাঁচত না কিছু। যদিও ছেলেটা টিউশনি করিয়েই নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে ফেলে তাও, বড়ো বোন হিসেবে ওইটুকু করার সাধ্যি তো এখন তারও আছে।
সবাই মেহেরুনকে অভিনন্দন জানাল। অথচ ওই লোকটা বাড়াবাড়ি করল একটু বেশিই। বিশাল একটা ফুলের বুকে এনে ধরল তার সামনে। অফিসের অতগুলো মানুষ, তার কলিগরা সেকি যে মজা নিল তখন। মেহেরুনের খুব মেজাজ খারাপ হলেও বলতে পারল না কিছুই। ভদ্রতা দেখিয়ে মুখে মেকি হাসি ফুটিয়ে গ্রহণ করল তা। ধন্যবাদও জানাল। মেহেরুন খেয়াল করল, লোকটা তার থেকেও বেশি খুশি। এমন ভাব, যেন প্রমোশোনটা সেই পাচ্ছে।
নিজের ডেস্কে ফিরে এল সে। মা-বাবাকে এই খবর জানাল। উনারা খুশি হলেন, দোয়া করলেন। কলটা কেটে দিতেই মেহেরুন দেখল, ওই লোকটা তার ডেস্কের সামনে। ইতস্তত ভঙিতে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। মেহেরুন ফোন রেখে জিজ্ঞেস করল, 'কিছু বলবেন?'
'আগামী শুক্রবার কি আপনি ফ্রি আছেন? আমার মা-বাবা আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাইছেন?'
হতভম্ব না হয়ে পারল না মেহেরুন। রেগেও গেল বোধহয়। কপালে ভাঁজ পড়ল সঙ্গে সঙ্গেই। খানিকটা তপ্ত গলাতেই বলে উঠল, 'আপনি কি আদতে সজ্ঞানে আছেন, আলভি সাহেব? কী বলছেন এসব? আপনার মা-বাবা আমার সঙ্গে কেন দেখা করবেন?'
'কেন দেখা করবেন সেটা আপনিও খুব ভালো করেই জানেন, মিস মেহেরুন। ইনফেক্ট এই অফিসের সবাই জানে। সবাই বোঝেও, শুধু আপনি বাদে। এত কঠিন কেন হতে হবে বলুন তো? একটু কি নরম হওয়া যায় না? মনটাকে পাথর কেন বানাচ্ছেন? একটা সুযোগ দিন।'
আকুতি প্রকাশ পেল ওই স্বরে। মেহেরুনের মন গলল না। বরং রাগ বাড়ল আরো।
'আপনাকে আর কতবার বললে আপনি বুঝবেন, আলভি সাহেব? আমি বিবাহিতা। আমার একটা ছয় বছরের মেয়ে আছে। আমি আপনার থেকে দুই বছরের বড়ো। তাও, তাও কেন আপনি এসব করে যাচ্ছেন? অফিসের প্রত্যেকটা মানুষ এই বিষয়টা নিয়ে মজা নেয়, হাসি তামাশা করে। ওসব কি আপনার চোখে পড়ে না, আলভি সাহেব?'
'পড়ে। কিন্তু ওসবে আমার কিছু যায় আসে না। আপনার মেয়ে, আপনার বয়স কিংবা আপনার পরিচয় কোনোটাতেই আমার কিছু যায় আসে না, মিস মেহেরুন। আমি শুধু একটাই কথা জানি, আমি আপনাকে ভালোবাসি। এর ঊর্ধ্বে আমি আর কোনোকিছুকে বিশ্বাস করি না।'
'বয়স আপনার কম নয়, আলভি সাহেব। কলেজ পড়ুয়া টিনেজ ছেলেদের মতো কথাবার্তা এই বয়সে মানায় না। আমি এখন আমার জীবনের এমন একটা পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে আমি ভালোবাসা মানে বুঝিই আমার মেয়েকে। আমার কাছে ও'ই সব। ওকে ঘিরেই আমার বেঁচে থাকা। এর বাইরে গিয়ে আমার আর কোনোকিছুতেই কোনো আগ্রহ আসে না। আর কখনো আসবেও না। তাই আবারও বলছি, আমার পেছনে সময় নষ্ট না করে ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে করুন, সংসার করুন। আমার দোয়া থাকবে।'
মেহেরুন নিজের ফাইলের দিকে মনোযোগ দিল। লোকটা দাঁড়িয়ে থাকল কতক্ষণ। তাকিয়ে রইল মেহেরুনের দিকে। হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসল, 'আপনি কি এখনো আপনার আগের স্বামীকে ভুলতে পারেননি, মিস মেহেরুন?
'এখন কিন্তু আপনি অনধিকার চর্চ করে ফেলছেন, আলভি সাহেব। এবার আপনার থেমে যাওয়া উচিত।'
বেশ কর্কশ স্বরেই বলল মেহেরুন। অথচ বিপরীতে লোকটা তখনও নির্লিপ্ত। পকেটে হাত পুরে সাবলীল স্বরে বলল, 'আপনার ব্যাপারে আপাতত আমি থামতে পারছি না। দুঃখিত তার জন্য। মনটার অবস্থা এতটাই বেহাল যে তা আর কোনোভাবেই সামলানো যাচ্ছে না। এবার আপনি দয়া না করলে আমার মৃত্যু নিশ্চিত। এরপর বাকিটা আপনার উপর।'
এতক্ষণে সে বের হলো। গিয়ে বসল নিজের ডেস্কে। মেহেরুন দাঁতে দাঁত চেপে বসে রইল শক্ত হয়ে। কাজে আর মনোযোগ দিতে পারল না। সেই শুরু থেকেই লোকটা তার পিছে পড়ে আছে। অফিসে তার থেকে এক পোস্ট উপরে তার পজিশন। প্রথম দিকে লোকটা তার ভালো বন্ধু ছিল। মেহেরুন অতকিছু বুঝত না তখন, ওই লোকটাই তাকে হাতে ধরে সব শিখিয়েছে। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ মেহেরুন তার সাথে দু একবার বাইরে গিয়ে খেয়েছেও। অথচ এসবের ফাঁকে ওই লোক যে তাকে কবে, কীভাবে পছন্দ করে বসল সেটা সে টের পায়নি। বিষয়ট বুঝতে পেরেছিল সেদিন, যেদিন সে মেহেরুনকে শাড়ির সঙ্গে একটা লাল গোলাপও উপহার দিয়েছিল, এবং ছোট্ট চিরকুটটাতে লিখেছিল, "আপনার সামনে এই ফুলের সৌন্দর্যও ভীষণ ফিকে।"
মেহেরুন এরপর আর দেরি করেনি। পরদিনই অফিসে এসে লোকটাকে সরাসরি বলে বসে, "আমি সিঙ্গেল মাদার, আমার একটা চার বছরের মেয়েও আছে।" শুনে কতক্ষণ নিষ্পলক চেয়ে থাকে সে। বিষয়টা হজম করতে সময় লাগে অনেকক্ষণ। পরে কিছুটা ধাতস্ত হওয়ার পর জিজ্ঞেস করে, 'সেপারেশন নাকি ডিভোর্স?'
'ডিভোর্সটা এখনো পুরোপুরি হয়নি। তবে আলাদা থাকছি।'
এরপরের দুটো দিন লোকটা একটু গম্ভীর হয়ে পড়লেও তিন দিনের মাথায় সে আবার আগের রুপেই ফিরে আসে। মেহেরুনকে সরাসরি গিয়ে জানায় নিজের পছন্দের কথাটা। মেহেরুন বোঝায় তাকে। এই সম্পর্কটা যে কোনোভাবেই সম্ভব না, তা তার মাথাতে গেঁথে দিতে চায়। তবে সে বুঝে না কিছুই। পিছেই পড়ে থাকে। তবে মেয়েটাকে কখনো সেভাবে বিরক্ত করে না। কিংবা তার জন্য মেহেরুনকে অস্বস্তিতে পড়ত হয়নি কখনো। ধীরে ধীরে অফিসের সবার সঙ্গে সঙ্গে মেহেরুনও বুঝতে পারে, লোকটা যে তাকে মন থেকেই পছন্দ করে। বুঝতে পারে, ওটুকুতে প্রেম আছে, ভালোবাসা আছে। তবে ওসব মেহেরুনের মনে ঠাঁই পায় না একটুও। এখন অবধিও না। অফিসের সবথেকে কাছের কলিগটাও মেহেরুনকে কত বোঝাল, কত কিছু বলল, কিন্তু তাতেও লাভের লাভ হলো না কিছুই। মেহেরুনের ওই কঠিন, ইস্পাতের মতো দৃঢ় মনটা কিছুতেই আর নরম হলো না।
চলবে...
সংগ্রহীত....
30/09/2026
#বিরহ_বৃত্তান্ত
#পর্ব_৩২
বসার ঘরটা হিমশীতল তখন। এতগুলো মানুষ, অথচ রা নেই কারোর ঠোঁটে। থেকে থেকে নিঃশ্বাসগুলোই নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে কেবল। সোফায় বসা ওয়াহীদ এবং তার বাবা। ঠিক তাদের বরাবর মেহেরুন, চেয়ারে বসা সে। পাশে তার বাবা বসে। মেহেরুনের মা দরজার কাছটায়। বড়ো করে ঘোমটা টেনে আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন শক্ত মুখে। সাদ সেখানে নেই, ঘরে। মা আসতে বারণ করেছেন।
ওয়াহীদরা এসেছে বেশিক্ষণ হয়নি। এই তো দশ, পনেরো মিনিট। সে যে এখনো বেশ অসুস্থ, তা মেহেরুন তার চোখ মুখ দেখেই বুঝল। বলল না কিছুই। জিজ্ঞেস করল না, কেমন আছেন। মেহেরুনের বাবাও না। তবে ছেলেটা অসুস্থ না হলে তিনি অবশ্যই কিছু কড়া কথা শোনাতেন, খানিক অপমানও করতেন। সেটা সম্ভব হয়নি বলে আপাতত নিজেকে শান্ত রেখে নরম সুরেই বলে উঠলেন,
'ভাইজান, আমার আর আমার মেয়ের সিদ্ধান্ত তো আপনাকে জানালামই। আশা করছি, এতকিছুর পর আপনার আর আপত্তি থাকবে না কোনো। আর থাকলেও আমি সেই আপত্তি আর গ্রহণ করব না, ভাইজান। তার জন্য আমি আগেই ক্ষমাপ্রার্থী।'
এই এক সপ্তাহে যেন মামুন শিকদারের বয়সটা একটু বেশিই বেড়েছে। দাড়ি, চুল যে কয়টা কাঁচা ছিল সেসবও পেকেছে এখন। চোখের নিচে ভাঁজ বেড়েছে। বেড়েছে শরীরের দুর্বলতা। গলার স্বরটায় আর আগের মতো শক্তি নেই। কেমন নিভু নিভু যেন,
'আমার কথাটা কি শেষবারের মতো শোনা যায় না?'
'না, ভাই। ক্ষমা করবেন, আর সম্ভব নয়। আমি আমার মেয়েটাকে হারাতে পারব না।'
ভদ্রলোক এবার মেহেরুনের দিকে তাকালেন। মেয়েটার মাথা নোয়ান। চোখ মেঝেতে। তিনি অসহায় গলায় ডাকলেন, 'মেহেরুন! মা, তুমিও কি এই অসহায় বাবাটার কথা আর শুনবে না?'
মেহেরুন চোখ বুজল। নিঃশ্বাস টানল জোরে। জিভ দিয়ে খরখরে ঠোঁটগুলো ভিজিয়ে নিয়ে ভীষণ ক্ষীণ সুরে বলে উঠল, 'আমায় ক্ষমা করবেন, বাবা।'
ওয়াহীদ এই পর্যায়ে চোখ তুলল। মেহেরুনের দিকে তাকাল সে। আসার পর এই প্রথম। সাহস করে এতক্ষণ তাকাতে পারেনি। অনুশোচনা আর অনুতাপেরা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। শারীরিক যন্ত্রণার চেয়ে মানসিক যন্ত্রণারা বেশি কষ্ট দিচ্ছিল তাকে। মেহেরুনকে চোখের সামনে দেখার পর তা হয়েছিল দ্বিগুণ। আর এখন তার কথা শোনার পর, তার দৃঢ়তা দেখার পর তা বেড়ে গিয়ে হয়েছে শতগুণ। ওয়াহীদ ঢোক গিলল ছোট্ট করে। স্ট্রোকের পর থেকে সে ভালোভাবে কথা বলতে পারে না। কষ্ট হয়। মাথায় প্রেশার লাগে। তাও সে বলল,
'আমায় কি শেষবারের মতো ক্ষমা করা যায় না, মেহেরুন?'
ওয়াহীদের গলার স্বর আজ অন্যরকম শোনাল। মেহেরুন যেন চিনতেই পারল না প্রথম। অবাক হলো, বিস্মিত হলো লোকটার শারীরিক দুর্বলতার পরিমাণ বুঝতে পেরে। তবে ওসব আর মুখে ফোটাল না। চোখও তুলল না। স্বাভাবিক থাকল আগের মতোই। সাবলীল স্বরে বলল,
'না।'
'মেহেরুন, কেউ নিজের ভুল বুঝতে পেরে ক্ষমা চাইলে তাকে ক্ষমা করে দিতে হয়।'
মেহেরুন মায়ের গলা এল ওই মুহূর্তে। সেই স্বরে রাগ মেশানো। মেহেরুনও বুঝল। তবে মানল না। মন নরম করল না। একই সুরে বলল, 'আমি দয়া দেখাতে পারলাম না, মা। এরপর বাকি জীবনটা নাহয় পৃথিবীর সব থেকে নির্দয় ব্যক্তিটা হয়েই বেঁচে থাকব।'
'জেদের বশে সিদ্ধান্ত নিও না, মেহেরুন। বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করো। এই সমাজে একটা ডিভোর্সী মেয়ের কেমন পরিণতি হয় তা তুমিও খুব ভালো করেই জানো।'
মেহেরুন মায়ের দিকে তাকাল। অবাক গলায় বলল, 'সমাজকে তোমরা এত ভয় পাও কেন, মা? এই সমাজ তোমাদের কী দিয়েছে? সুখে থাকলে হিংসা, বিপদে পড়লে আড়ালে দাঁড়িয়ে সমালোচনা, নিন্দা, বিদ্রুপ ছাড়া আর কী পেয়েছ এই সমাজ থেকে? আমার কষ্টের দিনগুলোতে তো এই সমাজ এসে পাশে দাঁড়ায়নি। আমার চোখের জল মুছিয়ে দেয়নি। তাহলে আজ আমার জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারটা ওদের কে দিল? আমি বুঝি না, মা, মেয়েদের সবসময় সমাজের কথা ভেবে চলতে হবে কেন? একজন পুরুষ ভুল করলে সমাজ বলে, মানুষ মাত্রই ভুল করে। আর একজন মেয়ে নিজের সম্মানের জন্য একটা সিদ্ধান্ত নিলে সমাজ তার চরিত্র, তার ভবিষ্যৎ, তার অস্তিত্ব নিয়ে বিচার বসায়। এই বিচার করার অধিকারটা ওরা আসলে কোথা থেকে পায়, বলতে পারো?'
থামল, এরপর ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলল সে। চোখদুটো কেমন নিষ্প্রভ হয়ে এলো তার,
'তোমরা ডিভোর্সে ভয় পাও, একা বেঁচে থাকাতে ভয় পাও, অথচ একটা অসম্মানজনক সম্পর্কে প্রতিদিন একটু একটু করে মরে যাওয়াটাকে স্বাভাবিক ভাবো। একটা মেয়ে হাসছে কি না, বাঁচছে কি না, তার কোনো মূল্য নেই; মূল্য শুধু এইটুকু যে তার নামের পাশে কারও স্ত্রী পরিচয়টা আছে কি না। আমি সমাজের ভয় বুঝি না, মা। আমি শুধু এটুকু বুঝি, মানুষের মর্যাদা হারিয়ে বেঁচে থাকাটা কোনো জীবন নয়। সমাজ আমার হয়ে কষ্ট পাবে না, সমাজ আমার হয়ে রাত জেগে কাঁদবেও না। তাহলে আমার জীবনের সিদ্ধান্তটা আমি সমাজের হাতে তুলে দেব কেন?'
মেহেরুনের মা আর রা করতে পারলেন না। কথা খুঁজে পেলেন না কোনো। দমে গেলেন তিনি। ভয়, দুশ্চিন্তা না কমলেও স্থির রাখলেন নিজেকে। মেহেরুন বড়ো করে নিঃশ্বাস ফেলল। ওয়াহীদের দিকে তাকাল এবার। বলল,
'আপনার এই অনুশোচনা, অনুতাপ আজীবন থাকুক, ওয়াহীদ। এসব আপনাকে সম্পর্কের মর্ম বুঝতে সাহায্য করবে, মনের ভুলগুলোকে ভাঙতে সাহায্য করবে। আমার চেষ্টায় তো আর সেসব হয়নি, এখন নাহয় দায়িত্বটা ওরাই নিক। আপনার উপর আমার আর কোনো রাগ নেই, অভিযোগ নেই। গায়ে হাত আমিও তুলেছি, তার জন্য ক্ষমা চাইব না। ওটা আপনার প্রাপ্য। আগামী তিন দিনের মধ্যেই তালাকনামা আপনার কাছে পৌঁছে যাবে। দয়া করে আমাকে মুক্তি দিবেন।'
এরপর মেহেরুন উঠে নিজের ঘরে চলে গেল। দোর আটকে দিল সঙ্গে সঙ্গেই। ওয়াহীদের ভেতরের শেষ আশাটুকু হাওয়ায় মিলিয়ে দিয়ে মেহেরুন লাপাত্তা হয়ে গেল কেমন। ওয়াহীদ বসে রইল স্তম্ভিত হয়ে। ভেতরটায় কিছু একটা খামচে ধরেছে ততক্ষণে। সামান্য নিঃশ্বাস ফেলতেও তার কষ্ট হচ্ছে এখন। সে বাবার দিকে তাকাল। বাচ্চাদের মতো কাঁদতে চাইছে হয়তো। বায়না করতে চাইছে এই বলে যে, "আব্বা, আমার মেহেরুনকে লাগবে। যেকোনো মূল্যে লাগবে।" সে পারল না সেটা। কেবল থেমে আসা গলায় কোনোরকম বলল,
'আব্বা, মেহেরুন তো আমায় ক্ষমা করল না। ফিরল না আমার কাছে।'
মামুন শিকদার কিছু বলার ভাষা পেলেন না। ভাইয়ের দিকে তাকালেন একবার। ভাইও সেই দৃষ্টি অগ্রাহ্য করে মাথা নামালেন। বোঝালেন, তারও আর কিছু করার নেই। ভদ্রলোক হতাশ হলেন। কষ্ট পেলেন এই ভেবে যে, তার ছেলের বাকি জীবনটাও তার মতোই কাটবে। তিনি ছেলের কাঁধে হাত রেখে বললেন,
'উঠ, বাবা। আমাদের এবার বেরুতে হবে।'
'আব্বা, মেহেরুন।'
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, 'আমরা কেউই দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বুঝি না রে, বাপ। হারানোর পরেই হায় হায় করি।'
ওয়াহীদ একা একা চলতে পারে না এখন। উঠতে বসতে কারোর সাহায্য প্রয়োজন। ডাক্তার বলেছেন, ধীরে ধীরে ঠিক হবে সব। মামুন শিকদার ছেলেকে ধরে উঠালেন। নিয়াজ সাহেবও দাঁড়ালেন সঙ্গে সঙ্গে। ভাইয়ের দিকে না তাকিয়েই বললেন, 'আমাদের কোনোপ্রকার বেয়াদবি হয়ে থাকলে মাফ করবেন, ভাই। এমনটা আমিও চাইনি। মেয়ের সুখ কোন বাবাই না চায়। আমিও চেয়েছিলাম। তা হলো না। বরং যা হলো, তারপর আমার আর সাহস নেই তাকে দ্বিতীয়বার ওই নরকে ঠেলে দেওয়ার। ক্ষমা করবেন আমায়।'
'বুঝতে পেরেছি আমি। বাবা তো আমিও। ছেলের জন্য অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। তোকে ওর অবস্থাটা আগেই বলে দেওয়া উচিত ছিল। ভুলটা আমারই। আমার জন্যই তোর মেয়েটার আজ এত কষ্ট। পারলে আমায় তুই ক্ষমা করিস।'
নিয়াজ সাহেব লজ্জা পেলেন। ভাইয়ের দিকে চেয়ে বললেন, 'এভাবে বলে আমাকে আর লজ্জা দিবেন না, ভাইজান।'
'বেশ। আসি তাহলে।'
চলে গেলেন উনারা। তিন দিন পরের কথা হলেও তালাকনামা গিয়ে শিকদার বাড়িতে পৌঁছাল পাঁচদিন পর। মেহেরুন সেখানে স্বাক্ষর করেই পাঠিয়েছিল। এবার ওয়াহীদের পালা। তবে ওয়াহীদ স্বাক্ষর করল না। বরং তার পনেরো দিনের মাথাতেই সে ওই ডিভোর্স পেপার সাথে নিয়ে পাড়ি জমাল ভিনদেশে। মেহেরুন আর তার বাবা কেউই আর চেষ্টা করে তার কোনো হদিস পেল না।
চলবে...
সংগ্রহীত....
29/09/2026
আমার তালাকের দিন বাবা আমার তালাকপ্রাপ্ত স্বামীকে সামনে দাঁড় করিয়ে শপথ করে বলেছিলেন,
“আমার মেয়েকে যে প্রথম বিয়ের প্রস্তাব দেবে, তার সঙ্গেই বিয়ে দেব। সে মানুষ হোক আর রাস্তার কুকুরই হোক!”
সেদিনই আমাদের পাশের বাড়ির মানসিক ভারসাম্যহীন বলে পরিচিত জুবায়ের ছুটে এসে বলেছিল,
“আমি বিয়ে করব ওকে!”
আমি ভেবেছিলাম বাবা হয়তো রাগের মাথায় কথা বলেছেন।
কিন্তু যখন দেখলাম বাবা সত্যিই জুবায়েরের সঙ্গে আমার বিয়েতে রাজি হয়ে গেলেন, তখন মনে হলো আমার পায়ের নিচ থেকে পুরো মাটিটাই সরে গেছে।
তবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা তখনও বাকি ছিল।
বিয়ের রাতে আমার সাবেক স্বামী আর তার পরিবারের সামনে আমার নতুন স্বামী যা করেছিল, সেটা দেখে সেখানে উপস্থিত সবাই একেবারে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।
কিন্তু সেই ঘটনা বোঝার আগে আমাকে একটু পেছনের কথা বলতে হবে।
আমার নাম নওশীন।
বিয়ের পর প্রথম কয়েকদিন আমি ভেবেছিলাম, নতুন সংসার মানেই হয়তো একটু সময় লাগবে মানিয়ে নিতে। নতুন মানুষ, নতুন বাড়ি, নতুন সম্পর্ক—সবকিছুই তো অপরিচিত।
কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বুঝে গিয়েছিলাম, আমি যে বাড়িতে এসেছি সেটা আমার জন্য সংসার নয়, একটা কারাগার।
আমার সাবেক স্বামী রাশেদকে বিয়ে করার পর তার আসল চেহারা ধীরে ধীরে আমার সামনে খুলে গিয়েছিল।
তার মা আমাকে কখনো নিজের ছেলের বউ হিসেবে দেখেননি। তার কাছে আমি ছিলাম বাড়ির একজন কাজের মানুষ।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করেও তার মন পাওয়া যেত না।
একটু দেরি হলে কথা শুনতে হতো।
কোনো কাজ তার পছন্দমতো না হলে অপমান শুনতে হতো।
আর রাশেদের ছোট বোন মেহরীন ছিল আরও এক ধাপ এগিয়ে।
আমি স্বামীর সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বললেও সে সেখানে ভুল খুঁজে বের করত।
আমি চুপ করে থাকলেও বলত,
“ভাবি এত চুপচাপ কেন? নিশ্চয়ই মনে মনে অনেক কিছু ভাবছে।”
আবার আমি একটু হাসিমুখে থাকলে বলত,
“ভাইয়া, তোমার বউ তোমাকে নিজের মতো করে চালাতে চাচ্ছে।”
একটা একটা করে কথা ঢুকতে ঢুকতে আমাদের স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা বিষিয়ে উঠেছিল।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় ছিল, রাশেদ নিজের কোনো সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারত না।
মা যা বলতেন, সেটাই সত্যি।
বোন যা বলত, সেটাই ঠিক।
আমি যতই বোঝানোর চেষ্টা করতাম, সে আমার কথা শুনত না।
একসময় আমি বুঝে গিয়েছিলাম, আমি একজন স্বামীকে বিয়ে করিনি।
আমি এমন একজন মানুষকে বিয়ে করেছি, যে নিজের সংসারের ব্যাপারে নিজের মনের কথাটুকুও বলতে পারে না।
দিনের পর দিন এভাবেই চলতে থাকল।
আমার বাবার বাড়ির মানুষজনও সবকিছু বুঝতে শুরু করল।
আমার মুখের দিকে তাকালেই মা বুঝে যেতেন আমি ভালো নেই।
বাবা প্রথমে আমাকে বলতেন,
“আরেকটু সহ্য কর মা। সংসারে সব সময় তো ভালো যায় না।”
আমি বাবাকে কিছু বলতাম না।
কারণ বাবার মুখের দিকে তাকালে আমার নিজের কষ্টের কথা বলতে ইচ্ছে করত না।
কিন্তু একটা সময়ের পর পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে চলে গেল যে আমার পরিবার আর চুপ থাকতে পারল না।
বাবা রাশেদের বাড়িতে গিয়ে কথা বললেন।
কয়েকবার দুই পরিবারের মধ্যে বসাবসি হলো।
আত্মীয়স্বজন এলেন।
পাড়ার মুরব্বিরাও বসে অনেক কথা বললেন।
কিন্তু রাশেদের মা বরং আরও বেশি জেদ ধরলেন।
তিনি বারবার বলতেন,
“মেয়েকে আমরা এনে রেখেছি, এখন ওর যদি থাকতে ভালো না লাগে, সেটা আমাদের দোষ না।”
রাশেদও মায়ের কথার বাইরে একটাও কথা বলত না।
বরং প্রতিবার আমার বাবাকে এমনভাবে কথা শোনানো হতো, যেন দোষটা আমারই।
এরপর শুরু হলো আরেক ধরনের চাপ।
আমাদের বাড়িতে ফোন করে কথা শোনানো।
বাবাকে অপমান করা।
আমাকে নিয়ে পাড়ায় নানা কথা বলা।
এমনকি এমন পরিস্থিতিও তৈরি করা হলো যে আমার বাবা নিজের মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেঙে পড়লেন।
শেষ পর্যন্ত এমন একটা সময় এলো, যখন আমি নিজেই বাবাকে বললাম,
“বাবা, আমি আর পারছি না। আমার কিছু লাগবে না। দেনমোহর, কাবিন, কোনো কিছুই লাগবে না। শুধু আমাকে এই সংসার থেকে বের করে দাও।”
বাবা সেদিন আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কিছু বলেননি।
শুধু চোখ মুছে অন্যদিকে তাকিয়ে ছিলেন।
তারপর শুরু হলো তালাকের প্রক্রিয়া।
কতবার যে আমাদের আদালত আর মানুষের বাড়ির বৈঠকে যেতে হয়েছে, তার হিসাব নেই।
কত অপমান, কত কথা, কত কান্না—সবকিছু মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত একদিন সেই তালাকটা সত্যিই হয়ে গেল।
আমি মুক্তি পেলাম।
কিন্তু সেই মুক্তির দিনটাও আমার জন্য শান্তির ছিল না।
তালাকের কাগজপত্র শেষ হওয়ার পর রাশেদ আমাদের বাড়ির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার মুখে সেই পরিচিত বিদ্রূপের হাসি।
সে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“মুবারক হোক চাচা। এবার মেয়ের জন্য ভালো একটা ছেলে খুঁজে নেবেন। অবশ্য আমার মতো তো আর পাবেন না।”
বাবা তখন এমনিতেই প্রচণ্ড রেগে ছিলেন।
রাশেদের কথাটা শুনে তার মুখ লাল হয়ে গেল।
তিনি এক মুহূর্তও চিন্তা না করে বলে ফেললেন,
“শুনে রাখ, আল্লাহর নামে কসম করে বলছি, আমার মেয়েকে যে প্রথম বিয়ে করতে চাইবে, তার কাছেই বিয়ে দেব। মানুষ হোক আর কুকুর হোক। তোর চেয়ে ভালো আর বিশ্বস্তই হবে!”
কথাটা বলেই বাবা ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিলেন।
ঠিক তখনই পাশের গলির দিক থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো।
“আমি!”
সবাই ঘুরে তাকাল।
আমাদের পাশের বাড়ির জুবায়ের দাঁড়িয়ে আছে।
জুবায়েরকে আমাদের এলাকার সবাই চিনত।
কেউ তাকে পাগল বলত, কেউ বলত মাথায় সমস্যা আছে।
সে কখনো এক জায়গায় স্থির থাকত না।
কখনো গলির মোড়ে বসে নিজের মনে কথা বলত।
কখনো রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ হেসে উঠত।
তার পোশাকও সব সময় এলোমেলো থাকত।
চুল বড় হয়ে কপালে পড়ে থাকত, দাড়িও ঠিকমতো কামানো হতো না।
অনেক সময় সে নিজের বাড়িতেও থাকত না।
এলাকার মানুষ যা দিত, তাই খেয়ে দিন কাটাত।
তবে একটা বিষয় আমি জানতাম।
জুবায়ের আমাকে কখনো অসম্মান করেনি।
বরং আমি যখনই তাকে দেখতাম, তার জন্য বাড়ি থেকে একটু খাবার নিয়ে আসতাম।
কখনো ভাত-তরকারি।
কখনো মিষ্টি।
কখনো বিস্কুট।
আমি তাকে বলতাম,
“জুবায়ের, আল্লাহ তোমার কষ্ট দূর করুন।”
সে তখন শিশুর মতো হাসত।
সেদিনও সে আমার বাবার কথাটা শুনেছিল।
আমাদের দিকে কয়েক পা এগিয়ে এসে হঠাৎ বলল,
“আমি নওশীনকে বিয়ে করব।”
রাশেদ কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে থাকল।
তারপর হো হো করে হেসে উঠল।
এমনভাবে হাসতে লাগল, যেন এর চেয়ে মজার কথা সে জীবনে শোনেনি।
সে বলল,
“এটাই তাহলে আপনার শেষ সিদ্ধান্ত চাচা? আপনার মেয়ের বিয়ে ওই জুবায়েরের সঙ্গে?”
বাবা এবার আরও রেগে গেলেন।
তিনি রাশেদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বললেন,
“তুই আমার বাড়ি থেকে বের হয়ে যা। আমার মেয়ে কাকে বিয়ে করবে সেটা নিয়ে তোর আর কোনো কথা বলার অধিকার নেই। আমি আল্লাহর নামে কসম করেছি। আর আমি আমার কথা রাখব।”
রাশেদ আবার হাসল।
হাসতে হাসতেই বলল,
“ঠিক আছে। তাহলে বিয়েতে আসব। নিজের চোখে দেখে যাব।”
তারপর সে চলে গেল।
রাশেদ চলে যাওয়ার পর বাবা জুবায়েরের দিকে তাকালেন।
একেবারে শান্ত গলায় বললেন,
“তুমি তোমার বাড়ির লোকজনকে বলো। আমি তোমাকে নওশীনের সঙ্গে বিয়ে দেব।”
জুবায়ের যেন কথাটা বিশ্বাসই করতে পারছিল না।
সে আনন্দে লাফিয়ে উঠল।
শিশুর মতো হাসতে হাসতে দৌড়ে নিজের বাড়ির দিকে চলে গেল।
আর আমি?
আমি তখন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
আমার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল না।
কেমন যেন সবকিছু অবশ হয়ে গিয়েছিল।
কিছুক্ষণ পর আমি বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
কাঁপা গলায় বললাম,
“বাবা, তুমি কী বলছ? জুবায়েরকে আমি কীভাবে বিয়ে করব? তুমি তো জানো ওর অবস্থা!”
বাবা আমার দিকে তাকালেন।
সেই দৃষ্টিতে রাগের চেয়ে বেশি ছিল এক ধরনের অসহায় জেদ।
তিনি বললেন,
“তুই কি চাস আমি আল্লাহর নামে করা কসম ভেঙে ফেলি?”
আমি চুপ হয়ে গেলাম।
বাবা আবার বললেন,
“আমি কথা দিয়েছি। আমি আমার কথা রাখব।”
আমি আর কিছু বলতে পারিনি।
নিজের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলাম।
তারপর বিছানায় মুখ গুঁজে এমনভাবে কাঁদলাম, যেন আমার জীবনে আর কোনোদিন কান্না শেষ হবে না।
মা আমার ঘরে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন।
তিনি নিজেও কাঁদছিলেন।
মা বাবাকে অনেক বোঝালেন।
বললেন,
“মানুষটা কেমন, তুমি জানো। মেয়েটার জীবনটা শেষ করে দিও না।”
কিন্তু বাবা শুধু একটা কথাই বলতেন,
“আমি কসম করেছি। আমি আমার কথা রাখব।”
দিনগুলো এরপর খুব দ্রুত চলে গেল।
আমি ভেবেছিলাম হয়তো কোনোভাবে এই বিয়ে থেমে যাবে।
হয়তো বাবা শেষ মুহূর্তে মত বদলাবেন।
কিন্তু তিনি বদলালেন না।
একদিন সত্যিই আমাদের বাড়িতে বিয়ের আয়োজন শুরু হয়ে গেল।
পাড়ার মানুষজন সব জানতে পেরে গেল।
আমার বিয়ে হচ্ছে জুবায়েরের সঙ্গে।
যে জুবায়েরকে সবাই এতদিন পাগল বলে এড়িয়ে চলত, সেই জুবায়েরই এখন আমার স্বামী হতে যাচ্ছে।
আমি তখনও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।
বিয়ের দিন আমি কনের সাজে বসে ছিলাম।
চারপাশে মানুষজন।
আত্মীয়স্বজন।
পাড়ার নারীদের ফিসফাস।
কেউ আমাকে দেখে মায়া করছিল।
কেউ আবার অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল।
কিন্তু আমার বুকের ভেতর তখন শুধু একটা কথাই ঘুরছিল—
আমার জীবনটা তাহলে সত্যিই এখানেই শেষ?
এর মধ্যেই খবর পেলাম রাশেদ তার মা আর বোনকে নিয়ে এসেছে।
আমার বুকটা ধক করে উঠল।
ওরা যে ভালো কিছু বলার জন্য আসেনি, সেটা বুঝতে আমার বেশি সময় লাগল না।
রাশেদের মা এসে আমাকে কনের সাজে বসে থাকতে দেখে ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন,
“এই হলো তোমার শেষ অবস্থা? আমার ছেলেকে ছেড়ে এখন এই জায়গায় এসে বসেছ?”
আমি মাথা নিচু করে রইলাম।
তিনি থামলেন না।
চারপাশের মানুষ শুনতে পায় এমন জোরে বললেন,
“আমার ছেলে তো বুঝদার ছিল বলেই তোমাকে ছেড়ে দিয়েছে। না হলে কে তোমাকে সহ্য করত?”
রাশেদের বোন মেহরীন পাশে দাঁড়িয়ে হেসে বলল,
“ভাবি, নতুন সংসার কেমন লাগছে? কাল সকাল থেকে কি আবার রাস্তায় বসে থাকতে হবে?”
ওদের কথায় আশেপাশের কয়েকজন অস্বস্তিতে পড়ে গেলেও কেউ কিছু বলল না।
রাশেদের মা আবার হেসে বললেন,
“ওকে নিয়ে বেশি চিন্তা করতে হবে না। জুবায়ের তো এখন ওকে নিয়ে ঘুরে বেড়াবে। যা পাবে, দুজন ভাগ করে খাবে।”
ওরা দুজন হেসে উঠল।
আমি আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলাম না।
কনের সাজে বসে বসেই কাঁদতে লাগলাম।
দূরে দাঁড়িয়ে বাবা সব শুনছিলেন।
তার মুখ লাল হয়ে উঠেছিল।
মনে হচ্ছিল তিনি প্রচণ্ড রেগে আছেন।
কিন্তু তিনি কোনো কথা বললেন না।
শুধু দাঁড়িয়ে রইলেন।
হয়তো তিনি জানতেন, আজ যদি একটা কথাও বলেন, তাহলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
কিছুক্ষণ পর রাশেদ নিজেই আমার সামনে এসে দাঁড়াল।
তার মুখে সেই পুরোনো বিদ্রূপের হাসি।
সে বলল,
“মুবারক হোক নওশীন। ভালো থেকো।”
তারপর জুবায়েরের দিকে ফিরে হাত বাড়িয়ে দিল।
“মুবারক হোক ভাই। সংসার করো, ভালো থেকো।”
জুবায়ের তখন আমার পাশে বসে ছিল।
রাশেদ তার দিকে তাকিয়ে এমন একটা কথা বলল, যেটা শুনে আশেপাশের সবাই হেসে উঠল।
“দেখি তো, তোমাদের ঘরেও তোমাদের মতো দু-একটা পাগল আসে কি না!”
রাশেদের মা আর বোনও সঙ্গে সঙ্গে হেসে উঠল।
আমার মনে হলো, আমি আর এক মুহূর্তও সেখানে থাকতে পারব না।
আমি চোখ নামিয়ে ফেললাম।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই জুবায়ের ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তার মুখের শিশুসুলভ হাসিটা আর নেই।
সে রাশেদের দিকে তাকাল।
চারপাশের হাসির শব্দ ধীরে ধীরে থেমে গেল।
রাশেদও হাসতে হাসতে থেমে গেল।
তারপর জুবায়ের এমন কিছু করল, যা দেখে রাশেদ, তার মা, তার বোন—তিনজনই একেবারে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে গেল।
আর আমি...
আমি নিজেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, আমার সামনে আসলে কী ঘটছে।
কারণ এতদিন যাকে সবাই পাগল বলে অবহেলা করেছে, তার আসল পরিচয় সম্পর্কে সেদিনই প্রথম একটা সত্য আমার সামনে আসতে যাচ্ছিল।
চলবে…..
সংরক্ষিত....
#কসম
#সূচনা_পর্ব
28/09/2026
#বিরহ_বৃত্তান্ত
#পর্ব_৩১
ঘুমাবে বলেও ঘুম হলো না মেহেরুনের। চোখের তারায় যে শূন্যতা ছিল তা তাকে ঘুমাতে দিল না। মৃত মানুষের মতো কেবল শুয়েই ছিল বিছানায়। চোখের পাতা বন্ধ হয়নি ক্ষনিকের জন্যও। মেহেরুনের বাবা নিয়াজ সাহেব ঘরে ফেরেন দ্রুতই। মা'ই ডেকে আনেন তাকে। মেয়েকে দেখার পর থেকেই দুশ্চিন্তায় কলিজা শুকিয়ে উঠছিল ভদ্রমহিলার। তাছাড়া গালের ওই দাগটাও তাকে বড্ড অশান্তি দিচ্ছিল।
মেহেরুন বিছানা ছাড়ল ঠিক সন্ধ্যার আজানের পর। উঠে মাগরিবের নামাজটা পড়ল আগে। মোনাজাতে বসে অঝোরে কাঁদল কতক্ষণ। কার জন্য কাঁদল নিজেও বুঝল না। এরপর জায়নামাজ ভাঁজ করে রেখে বের হয়ে গেল মা-বাবার ঘরে। মানুষ দুটো যেন তারই অপেক্ষায় চাতক পাখির মতো বসে ছিলেন এতক্ষণ। মেয়েকে দেখা মাত্রই নিয়াজ সাহেব বিছানা ছেড়ে এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন। কপালে চুমু খেলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
'কেমন আছিস, মা?'
মেহেরুন চোখ তুলে বাবার দিকে তাকাতে পারল না। মাথা নুইয়েই বলল, 'ভালো।'
গালের দাগটা তখনও তাজা বেশ। নিয়াজ সাহেবও দেখলেন। বুকের ভেতরটা মোচড়াল। মেয়েকে বিছানায় বসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, 'কে মেরেছে, ওয়াহীদ?'
মেহেরুন ছোট্ট করে বলল, 'হু।'
নিয়াজ সাহেব বাক হারালেন। বুকের ভেতর ব্যথা হলো। শরীরটা দুর্বল হলো মুহূর্তেই। এত বিশ্বাস করে যার হাতে মেয়েটাকে তুলে দিয়েছিলেন, সে মেয়েটার গায়ে হাত তুলল! এত জঘন্য ও! এত নির্দয়! তিনি বিশ্বাস করতে পারলেন না। নিজের এত বছরের মানুষ চেনার অভিজ্ঞতা তাকে এভাবে ধোঁকা দিল! কষ্ট হলো উনার। অসাড় হয়ে পড়ল পুরো শরীর। মেহেরুন নিজ থেকেই বলল, 'আমিও উনাকে মেরেছি।'
আচমকা বোমা পড়ার মতোই পরিবেশ সেখানে। বিস্মিত দুই জোড়া চোখ একসঙ্গে স্থির হলো তার দিকে। মেহেরুনের মা একটুও বেশিই অবাক হলেন। রেগেও গেলেন কিনা বোঝা গেল না। বলে উঠলেন, 'তুই তোর স্বামীর গায়ে হাত তুলেছিস, মেহেরুন?'
'হ্যাঁ, মা।' দ্বিধা ছাড়া স্বীকারোক্তি মেয়ের। মা হজম করতে পারলেন না সেই কথা। মেয়ের দুই বাহু ধরে ঝাঁকিয়ে বললেন,
'তুই কি পাগল, মেহেরুন? নিজের স্বামীর গায়ে কেউ হাত তুলে? এটা কত বড়ো পাপ জানিস?'
'আর উনি যে আমায় মারলেন?' মাথাটা কাত করে মেহেরুন অসহায় গলায় জিজ্ঞেস করল। মেহেরুনের মায়ের অস্থিরতা, উত্তেজনা কমল না তাতে। বরং গলার স্বরে এখন যোগ হলো তেজ,
'স্বামীরা রাগের বশে এমন হালকা পাতলা ভুল করেই থাকেন। সেটা হলে পরিবারকে জানাতে হয়, বড়োদের জানাতে হয়। কিন্তু কোনো স্ত্রী কি স্বামীর গায়ে পাল্টা হাত তুলতে পারে? এখন যদি ওয়াহীদ তোর সাথে সংসার করতে না চায়? বা করলেও আগের মতো সেই মায়া, মমতাটা কি আর থাকবে?'
মায়ের কথাগুলো শুনে মেহেরুন হাসল। শব্দ করেই হাসল। হাসিতে উপচে পড়ল তীব্র বিদ্রূপ, দীর্ঘদিনের জমে থাকা হতাশা আর একরাশ তিক্ততা। অবশ্য সে নিজের মায়ের উপর হাসছিলই না। হাসছিল সেই মানসিকতার উপর, যে মানসিকতা যুগের পর যুগ ধরে নারীদের কেবল সহ্য করতে শিখিয়েছে। হাসছিল এমন এক সমাজকে দেখে, যেখানে একজন স্বামীর অন্যায়কে মুহূর্তেই "রাগের মাথার ভুল" বলে ক্ষমা করে দেওয়া হয়, অথচ একজন স্ত্রীর প্রতিবাদকে বানিয়ে ফেলা হয় অপরাধ।
কী অদ্ভুত নিয়ম! একজন পুরুষ হাত তুললে তাকে বলা হয় রাগ, আর একজন নারী নিজের সম্মান বাঁচাতে হাত তুললে তাকে বলা হয় অবাধ্যতা। একজনের ভুলের জন্য খোঁজা হয় শত অজুহাত, আর অন্যজনের আত্মরক্ষার জন্যও তৈরি হয় বিচারসভা।
মেহেরুনের সবচেয়ে বেশি বিস্ময় লাগল এই ভেবে যে, তার মা-ও বিষয়টাকে অন্যায় হিসেবে দেখলেন না। বরং উদ্বিগ্ন হলেন এই ভেবে যে, ওয়াহীদের মায়া-মমতা কমে যাবে কি না, সে আর সংসার করতে চাইবে কি না। যেখানে শুরু থেকেই এই সংসারের প্রতি মানুষটার কোনো টানই ছিল না।
এই সমাজে মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় সংসার বাঁচাতে, সম্পর্ক আগলে রাখতে, মানিয়ে নিতে। অথচ সেই সংসার, সম্পর্ক বাঁচাতে গিয়ে, সবকিছুর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে গিয়ে সেই মেয়েটা যে জীবন্ত লাশ হয়ে যায়, সেটা কেউ দেখে না। প্রয়োজনবোধও করে না।
মেহেরুন নিঃশ্বাস ফেলল জোরে। ওসব আর ভাবলে ভেতরেটা মরে যাবে তার। নতুন করে একটু বাঁচার আশায় সে বাবার দিকে চেয়ে বলল, 'আমি ওয়াহীদকে ডিভোর্স দিতে চাই, বাবা।'
নিয়াজ সাহেব এবার আর অবাক হলেন না। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন তিনি। গলার স্বর নরম করে বললেন, 'তুই যা চাইবি, তাই হবে মা।'
'তুমি কি পাগল হয়েছ, মেহেরুনের বাবা? বুঝতে পারছ কী বলছ?' ভদ্রমহিলা রেগে যাচ্ছেন। দুশ্চিন্তায় কপালে ঘাম জমছে তার।
'হ্যাঁ, আমি সব বুঝে শুনেই বলছি। কোনো অমানুষের সাথে আমি আমার মেয়েকে আর সংসার করতে দিব না। সেই শুরু থেকেই আমি এসব সহ্য করে এসেছি। ভাইয়ের কথা ভেবে কোনো পদক্ষেপ নেইনি। আর না। ওর এত বড়ো সাহস হয় কী করে যে, আমার মেয়ের গায়ে হাত তোলে!'
'আর তোমার মেয়ে যে ওকে মারল, সেটা?'
'বেশ করেছে। যে যেমন তার সাথে তেমন আচরণই করতে হয়। ওয়াহীদ এটারই যোগ্য। আমি এখানে মেহেরুনের কোনো দোষ দেখছি না।'
অস্থিরতা এবার আকাশ ছুঁল ভদ্রমহিলার। তিনি বিলাপ ছাড়লেন, 'বাপ, মেয়ে দুটোই পাগল হয়েছে তোমরা। সমাজে আর মুখ দেখাতে হবে না। বিয়ের এক বছর গেল না, তালাক। এরপর আর মেয়েকে বিয়ে দিতে পারবে? কে বিয়ে করবে ওকে?'
'কারোর বিয়ে করতে হবে না, মা। আমার আপু আজীবন আমাদের কাছেই থাকবে। তবুও কোনো অভদ্র, কাপুরুষের হাতে আমি আমার আপুকে তুলে দিব না।'
দরজার কাছে দাঁড়ান ছেলের কথা শুনে হতভম্ব হলো সবাই। স্কুল থেকে এসেই বোনের কথাগুলো শুনছিল সে। আর শোনা মাত্রই সদ্য সতেরোতে পা দেওয়া ছেলেটা কেমন রেগে গেল। ওই লোকটা, যে বোনকে মেরেছে তাকে মনে মনে গালি দিল অনেকগুলো। মারতেও ইচ্ছে করছিল খুব। তবে নিজেকে সংযত রেখে সে বোনের পাশে দাঁড়াল তখন। কড়া গলায় জানাল, সে বোনকে কোনোভাবেই ওই ছেলের হাতে আর তুলে দিবে না। কখনোই না।
ছেলের কথায় গর্জে উঠলেন তাদের মা। সে কেন বড়োদের মধ্যে কথা বলতে এসেছে সেই নিয়েই ছেলেকে বকলেন অনেকক্ষণ। তবে সাদও দমল না। ঘরে যাওয়ার আগে আরেকবার বলে গেল, সে তার বোনকে এই বাড়িতেই রাখবে। আজীবন রাখবে। তাও ওই ছেলের হাতে আর তুলে দিবে না। ভদ্রমহিলা অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেন খুব। এই নিয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করলেন অনেকক্ষণ। নিয়াজ সাহেবের একপ্রকার বিরোধ হলো স্ত্রীর সঙ্গে। তিনি স্ত্রীকে কোনোভাবেই বোঝাতে না পেরে শেষে রেগে মেগে বাসা ছাড়লেন। মেহেরুন একাই বসে রইল তখন। রা হীন, নীরব হয়ে। চোখগুলো ছলছল করলেও, কান্না পেলেও কাঁদল না সে। বরং নিজের সিদ্ধান্তেই অটুট থাকল শেষ পর্যন্ত।
রাতে নিয়াজ সাহেবের ফোনে ওয়াহীদের বাবা কল করলেন। জানালেন, ওয়াহীদ হাসপাতালে ভর্তি, সে নাকি স্ট্রোক করেছে। তিনি অত কিছু জানতেন না। মেহেরুনের কথা জিজ্ঞেস করলেন তাই। নিয়াজ সাহেব আজ কড়া গলায় জানালেন, 'আমার মেয়ে আর ফিরবে না, ভাই। আপনার ছেলে আমার মেয়ের গায়ে হাত তুলেছে, এরপর আর কোনোভাবেই আমি ওকে আর ও বাড়িতে পাঠাব না। এটাই আমার শেষ সিদ্ধান্ত। এবং উকিলের সাথে কথা বলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমি ওদের ডিভোর্সের ব্যবস্থা করব।'
এরপর ভাইয়ের কোনোপ্রকার কথা না শুনেই কলটা কেটে দিলেন তিনি। এসব শুনে রাত বাড়তেই প্রেশার হাই হলো মেহেরুনের মা'র। মেয়ের অনাহূত ভবিষ্যতের চিন্তায় তার জীবন যাচ্ছিল যেন। নিয়াজ সাহেব তাকে প্রেশারের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিলেন। ওয়াহীদের স্ট্রোক করার সংবাদ ততক্ষণে মেহেরুনের কানেও চলে গিয়েছিল। চমকানো, থমকানো রেখে নামাজে দাঁড়িয়ে ছিল সঙ্গে সঙ্গেই। আল্লাহকে বলেছিল,
'উনাকে বাঁচিয়ে রেখো, খোদা। নিজের অন্যায়টুকু বোঝার জন্য হলেও উনার বেঁচে থাকা উচিত। তাছাড়া উনার বাবার উনি ছাড়া আর কেউ নেই। ওই ভালো মানুষটার কথা চিন্তা করে হলেও সুস্থ করে দিও উনাকে।'
রাতে দোয়া করেও আর ঘুমাতে পারল না মেহেরুন। সারারাত বিছানায় এপিঠ ওপিঠ করেই কাটাল। ভোর হতেই কল করল খালাকে। ওয়াহীদের কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি জানালেন, জ্ঞান এখনো ফেরেনি, তবে ডাক্তার জানিয়েছে শীঘ্রই ফিরবে। সেদিন দুপুরেই ওয়াহীদের জ্ঞান ফিরে। এবং তার এক সপ্তাহ পরেই সে বাবাকে নিয়ে মেহেরুনের বাড়িতে এসে হাজির হয়। ততদিনে মেহেরুনের বাবাও উকিলের সাথে সব কথা বলে ফেলেছে। মেহেরুনও তৈরি সম্পূর্ণ। এবার নাহয় মুখোমুখি বসেই সম্পর্কের বাকি হিসেবটুকু মেটানো যাবে।
চলবে...
সংগ্রহীত....
Category
Website
Address
Bangladesh
Dhaka
Alerts
Be the first to know and let us send you an email when Broken Heart posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.
